সরকারি প্রশিক্ষণেই বাজিমাত! তালপাতার খেলনায় নতুন চমক দিয়ে তাক লাগালেন বীরভূমের গৃহবধূ

বীরভূমের রাজনগর ব্লকের প্রত্যন্ত গ্রাম বাঁন্দী। সেখানকার গৃহবধূ যূথিকা রায় প্রমাণ করেছেন, সদিচ্ছা আর একটু নতুন ভাবনা থাকলে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকেও সহজে মূল স্রোতে ফেরানো যায়। বাংলার গ্রামীণ মেলার সেই পুরনো ‘তালপাতার সেপাই’ আজ প্রায় অতীত। নব্বইয়ের দশকের নস্ট্যালজিয়া আজ শুধুই স্মৃতি। কিন্তু যূথিকার হাতের জাদুতে সেই তালপাতার খেলনা এবার ফিরছে মোটু-পাতলু, জন আর ডক্টর ঝটকার মতো জনপ্রিয় কার্টুনের রূপ নিয়ে।
যূথিকার স্বামী পবিত্র রায় গ্রামে ফুচকা ও চাউমিন বিক্রি করে সংসার চালান। পরিবারের আর্থিক দিক সামলাতে যূথিকাও একসময় শাড়িতে কাঁথাস্টিচের কাজ করতেন। তাঁদের ভাগ্য বদলের শুরু ২০২৩ সালে। ওই বছর রাজনগরে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলাদের জন্য একটি সরকারি প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। সেখানে তালপাতা দিয়ে ফুল, সাজি এবং নানা ঘর সাজানোর জিনিস তৈরি শেখানো হয়েছিল। প্রায় ৪৫ জন মহিলা সেই প্রশিক্ষণ নিলেও, বিষয়টি নিয়ে পেশাদার স্তরে চিন্তাভাবনা করেন একমাত্র যূথিকাই।
প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পর তিনি নিজের ভাবনায় তৈরি করতে শুরু করেন ঐতিহ্যবাহী তালপাতার সেপাই। তবে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পুরনো ধাঁচেই তিনি নিয়ে আসেন নতুন চমক। আজকের শিশুদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে চিরাচরিত সেপাইয়ের পাশাপাশি তিনি কার্টুন চরিত্র তৈরি করতে শুরু করেন। নবম শ্রেণিতে পড়া ছেলে সুমন ইন্টারনেট থেকে মায়ের জন্য এই কার্টুনগুলোর ছবি নামিয়ে দেয়, যা দেখে নিখুঁত পুতুল বানান যূথিকা।
পুতুলগুলো যাতে সহজে নষ্ট না হয় এবং টেকসই হয়, তার জন্য একটি বিশেষ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করেন তিনি। প্রথমে সংগৃহীত তালপাতা ভালো করে শুকিয়ে নেওয়া হয়। এরপর পাতা ব্লিচ করার জন্য হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড মেশানো গরম জলে তা সেদ্ধ করা হয়। এতে পাতার ভেতরের সবুজ ভাব কেটে যায়। ফলে পুতুলের রং দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং পোকার আক্রমণের ঝুঁকি থাকে না।
এর পাশাপাশি গরিব পরিবারের মায়েদের কথা ভেবে দারুণ এক কৌশল নিয়েছেন যূথিকা। তিনি একটি পুতুলের দু’দিকে দুটো আলাদা কার্টুন চরিত্র আঁকেন। যূথিকার মতে, নিজে গরিব ঘরের মা হওয়ায় তিনি বোঝেন মেলায় গেলে বাচ্চারা যখন দুটো পুতুলের বায়না করে, তখন সব মায়ের পক্ষে তা কিনে দেওয়া সম্ভব হয় না। তাই এক পুতুলেই দুই চরিত্র থাকলে মা ও শিশু দুজনের মুখেই হাসি ফোটে।
দাদু-ঠাকুমারা মেলায় এসে নস্ট্যালজিয়া থেকে যেমন এই তালপাতার খেলনা কেনেন, তেমনই ছোটরাও নতুন কার্টুনের রূপ দেখে আনন্দে মেতে ওঠে। এখন মরসুমে তিন থেকে চারটি মেলায় পুতুল বিক্রি করেই যূথিকা ও পবিত্র রায়ের সংসারে সচ্ছলতা ফিরেছে। নিজের বুদ্ধি আর পরিশ্রমে বিলুপ্তপ্রায় একটি লোকশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার পাশাপাশি তিনি আজ হয়ে উঠেছেন স্বনির্ভরতার এক অনন্য উদাহরণ।