বের করে দেওয়ার প্রতিশোধ! চালকের সাজানো ভয়ংকর ছকে মুম্বইয়ে গ্রেপ্তার আয়কর দপ্তরের দুই কর্মীসহ ১০

বলিউডের বিখ্যাত সিনেমা ‘স্পেশাল ২৬’-এর প্লট যেন বাস্তবের মাটিতে আছড়ে পড়ল মুম্বইয়ে! ভুয়ো ইনকাম ট্যাক্স এবং ক্রাইম ব্রাঞ্চের আধিকারিক সেজে ব্যবসায়ীর দপ্তরে হানা দিয়ে কোটি টাকা রঙদারি বা extortion চাওয়ার এক চাঞ্চল্যকর ঘটনার পর্দাফাঁস করল মুম্বইয়ের অন্ধেরি পুলিশ। এই অপরাধের নেপথ্যে থাকা আসল সত্যটি আরও বেশি শিহরণ জাগানোর মতো—কারণ এই ভুয়ো চক্রের সঙ্গে শুধু অপরাধীরাই নয়, সরাসরি যুক্ত ছিলেন খোদ আয়কর বিভাগের এক আসল ইনকাম ট্যাক্স ইন্সপেক্টর ও এক ট্যাক্স অ্যাসিস্ট্যান্ট! এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় মাস্টারমাইন্ড প্রাক্তন চালক এবং তিন মহিলাসহ মোট ১০ জন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
বদলার আগুনে জ্বলে মাস্টারমাইন্ডের ছক
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এই পুরো ষড়যন্ত্রের পেছনে কাজ করেছে পুরোনো ক্ষোভ ও প্রতিশোধের স্পৃহা। এই মামলার মূল অভিযোগকারী হলেন ৪9 বছর বয়সি ব্যবসায়ী রাজকুমার কণ্ডাসামী, যাঁর অন্ধেরিতে অফিস রয়েছে। এই ঘটনার মূল চক্রী হলো সন্তোষ উদয় খোপরকর, যিনি অতীতে ওই ব্যবসায়ীর কাছেই ড্রাইভার বা চালকের কাজ করতেন।
কিছুদিন আগে দুই পক্ষের মধ্যে গোলমালের জেরে ওই ব্যবসায়ী সন্তোষকে ছ’মাসের বেতন না দিয়েই চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছিলেন। সেই অপমানের বদলা নিতেই খাস ব্যবসায়ীর সমস্ত গোপনীয় তথ্য ও গোপন খবর ব্যবহার করে এই ভয়ংকর ফন্দি আঁটে সে। নিজের পরিকল্পনা সফল করতে সে ৬ জন পুরুষ ও ৩ জন মহিলাকে নিয়ে আস্ত একটি গ্যাং তৈরি করে, যা একদম ‘স্পেশাল ২৬’ ছবির আদলে সাজানো হয়েছিল।
অফিসে হানা, ফোন কেড়ে নিয়ে বন্দি রাখার ভয়
গত সপ্তাহে পরিকল্পনা অনুযায়ী অভিযুক্তরা জালিয়াতি করে তৈরি ভুয়া এবং কিছু আসল সরকারি পরিচয়পত্র দেখিয়ে সোজা ব্যবসায়ীর অফিসে ঢুকে পড়ে। এরপর কর্মচারীদের ইনকাম ট্যাক্স ও ক্রাইম ব্রাঞ্চের রেড চলছে বলে চূড়ান্ত ভয় দেখাতে শুরু করে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, অভিযুক্তরা ব্যবসায়ী রাজকুমার কণ্ডাসামী এবং তাঁর স্ত্রীকে অপহরণ করার চেষ্টা পর্যন্ত চালায়।
অফিসের সমস্ত দরজা বন্ধ করে দিয়ে ব্যবসায়ী, তাঁর স্ত্রী এবং উপস্থিত ১০ জন কর্মীর মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর তাদের সবাইকে সোজা জেলে পাঠিয়ে দেওয়ার এবং বিশাল অঙ্কের জরিমানা করার ভয় দেখিয়ে মামলা ধামাচাপা দেওয়ার শর্তে ১ কোটি টাকা দাবি করা হয়। কোনোমতে সেই ত্রাসের রাজত্ব থেকে প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে অন্ধেরি থানায় এসে সমস্ত ঘটনার লিখিত অভিযোগ জানান ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী।
জালে দুই সরকারি কর্মীসহ গ্যাংয়ের সবাই
অভিযোগ পাওয়ার পরই নড়েচড়ে বসে অন্ধেরি থানার পুলিশ। টেকনিক্যাল সার্ভেইলেন্স এবং গোপন খবরের ভিত্তিতে পুলিশ প্রথমে মূল অভিযুক্ত সন্তোষ খোপরকর এবং তার সহযোগী বিনয় রমেশ মোরে, প্রেম কিশন সবনানি, প্রজ্ঞা হতীশ মাইন, রেশমা শামরাও ওয়ারং ও সবিনা হাফিজ শেখকে পাকড়াও করে।
ধৃতদের জেরা করতেই বেরিয়ে আসে আসল চাঞ্চল্যকর তথ্য। পুলিশ জানতে পারে, ওই দিন ব্যবসায়ী রাজকুমার কণ্ডাসামীর অফিসে যখন এই ভুয়ো রেড চলছে, তখন অপরাধীদের সঙ্গ দিতে সেখানে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন খোদ আয়কর দপ্তরে কর্মরত ইন্সপেক্টর সুরেশ মহাবীরপ্রসাদ মিশ্র (৫৭) এবং ট্যাক্স অ্যাসিস্ট্যান্ট সুনীল মনোহর গোরে (৫৯)। পুলিশ কালবিলম্ব না করে এই দুই দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি কর্মীকেও হাতেনাতে গ্রেপ্তার করেছে। ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-র একাধিক কঠোর ধারায় মামলা রুজু করে এই হাই-প্রোফাইল গ্যাংয়ের বাকি শিকড় কতদূর বিস্তৃত, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।