ইরানের মিসাইল কি আর পৌঁছবে না? ভূমধ্যসাগরের তীরে ভারতের বন্ধু দেশের মেগা তেল হাব নিয়ে চাঞ্চল্য!

পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান তীব্র সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে নিজেদের তেল সরবরাহ ও বৈদেশিক বাণিজ্য সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখতে এক অত্যন্ত দূরদর্শী ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং যেকোনো ধরনের আঞ্চলিক সংকটের ঝুঁকি এড়াতে এবার মিশরের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের অত্যন্ত নিরাপদ ও কৌশলগত স্থানে একটি বিশালাকার নতুন তেল ও গ্যাস সংরক্ষণ ও বাণিজ্য কেন্দ্র গড়ে তুলেছে আবুধাবি। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই পদক্ষেপটিকে অন্যতম যুগান্তকারী মোড় হিসেবে চিহ্নিত করছেন ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।
প্রায় ৭৩৮,০০০ বর্গমিটার বা প্রায় ৭৩৭,৯১৪.৯ বর্গমিটার সুপরিসর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই বিশেষ ব্যক্তিগত মুক্তাঞ্চলে অপরিশোধিত তেল এবং রকমারি পেট্রোলিয়াম পণ্যের সুদৃঢ় সংরক্ষণ ও আন্তর্জাতিক ব্যবসার জন্য সমস্ত অত্যাধুনিক পরিকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে ফুজাইরাহ আলামেইন অয়েল অ্যান্ড গ্যাস কোম্পানির তত্ত্বাবধানে। সম্প্রতি মিশরের অফিসিয়াল গেজেট মারফত জানা গেছে যে, এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুক্তাঞ্চলটি মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া-মাতরুহ উপকূলীয় সড়কের দক্ষিণে নিউ আলামেইনে অবস্থিত এবং ইতিমধ্যেই মিশরের ক্যাবিনেট বা মন্ত্রিসভা এই প্রকল্পে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন প্রদান করেছে। কোম্পানির প্রাথমিক প্রতিষ্ঠা প্রক্রিয়া এখন সম্পূর্ণ শেষের পথে।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে যে, ফুজাইরাহ থাকতে হঠাৎ করে মিশরের মাটিতে এমন নতুন তেল ঘাঁটি তৈরি করার প্রয়োজন কেন পড়ল? উল্লেখ্য, ফুজাইরাহ ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান তেল সংরক্ষণ ও বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত, যার রয়েছে বিশাল সংরক্ষণ ক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে সরাসরি অবাধ প্রবেশাধিকার। তা সত্ত্বেও পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান যুদ্ধংদেহী ও অস্থির সামরিক পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে, জ্বালানি তেল ও বাণিজ্যের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় কেবল একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় বা নির্দিষ্ট স্থানে কেন্দ্রীভূত করে রাখা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। মিশরের নিউ আলামেইনে অবস্থিত সুপরিচিত আল-হামরা পেট্রোলিয়াম বন্দরকে কেন্দ্র করে এই নতুন হাবটি গড়ে তোলার ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে তেল সম্পদ নিরাপদ রাখা সম্ভব হবে। মিশরের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের অভিমত অনুযায়ী, এই দ্বিপক্ষীয় কৌশলগত অংশীদারিত্বের মূল লক্ষ্য হলো আল-হামরা বন্দরের বিদ্যমান পরিকাঠামো ও সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক তেল বাণিজ্যের নেটওয়ার্ককে আরও বেশি শক্তিশালী ও বহুমুখী করা।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই নতুন তেল ঘাঁটিটি ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত হওয়ার কারণে তা কার্যত ইরানের সামরিক ও ক্ষেপণাস্ত্র নাগালের সম্পূর্ণ বাইরে। যদিও এই বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি, তবে ভৌগোলিক অবস্থানগত দিক থেকে বিচার করলে ফুজাইরার তুলনায় নিউ আলামেইন উপসাগরীয় উত্তপ্ত অঞ্চল থেকে অনেক দূরে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থিত। ফলস্বরূপ, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান বা অদূর ভবিষ্যতে উদ্ভূত হতে চলা যেকোনো সামরিক সংঘাতের মাঝেও তেল সরবরাহ শৃঙ্খলের ভৌগোলিক ঝুঁকি কমাতে এই নতুন প্রকল্পটি এক অকাট্য সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে যদি হরমুজ প্রণালী কিংবা উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধের কারণে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায় বা প্রধান সমুদ্রপথগুলি মারাত্মক চাপের মুখে পড়ে, তবে তেল মজুত ও বিশ্ববাজারে তা সরবরাহের জন্য ইউএই ও তার মিত্রদের হাতে ভূমধ্যসাগরে একটি সুরক্ষিত বিকল্প রুট ও হাব থাকবে।
এই বিশাল প্রকল্পের মাধ্যমে শুধুমাত্র সংযুক্ত আরব আমিরাত বা জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে তা নয়, এর ফলে অর্থনৈতিকভাবে দারুণভাবে লাভবান হতে চলেছে মিশরও। নিজেদের দেশের অনুকূল বন্দর, আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে মিশর এবার জ্বালানি পণ্যের সংরক্ষণ ও বাণিজ্যের একটি অন্যতম প্রধান আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে চাইছে। এই আন্তর্জাতিক প্রকল্পটি মিশরের অর্থনীতিতে বিশাল অঙ্কের বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ পেট্রোলিয়াম পরিকাঠামোকে ঢেলে সাজানোর এক সুবর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছে। এই মুক্তাঞ্চলের একটি অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক এবং কঠোর শর্ত রয়েছে, তা হলো—এখানে উৎপাদিত বা সংরক্ষিত জ্বালানির সম্পূর্ণ অংশই আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করতে হবে। অর্থাৎ, মিশরের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর চেয়ে বৈশ্বিক বাজারের সরবরাহ চেইন সচল রাখাই এই প্রজেক্টের মূল লক্ষ্য। নিউ আলামেইনকে একটি আদর্শ লজিস্টিকস পয়েন্ট হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে, যেখান থেকে বিশ্ববাসীর চাহিদা অনুযায়ী অতি দ্রুত তেল সংরক্ষণ ও তা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজারে সফলভাবে পরিবহন করা সম্ভব হবে।