চা-বাগানের মাঝে রূপকথার মতো সাজানো ব্রিটিশ সাহেবদের সমাধি! আজ অযত্ন আর অবহেলায় কেন ধুঁকছে ডুয়ার্সের এই ঐতিহাসিক কবরস্থান?

চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে সবুজ চা-বাগান। দেখে মনে হবে কেউ যেন বিস্তীর্ণ এলাকায় সবুজ গালিচা বিছিয়ে দিয়েছে। আর ঠিক সেই মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্যের মাঝেই আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি প্রাচীন তোরণদ্বার। তবে তার চারপাশে ভাঙাচোরা সীমানা প্রাচীর আর ভগ্নদশাগ্রস্ত কিছু ইউরোপিয়ান সাহেবের কবর দেখলেই স্পষ্ট বোঝা যায়, কালের নিয়মে এর বয়স প্রায় দু’শো বছর ছুঁইছুঁই। জলপাইগুড়ি জেলার মালবাজার ব্লকের রাঙামাটি চা-বাগানের চাইবাসা ডিভিশনের এই সমাধিস্থল আজ শুধু একটি ইতিহাস বিজরিত স্থানই নয়, বরং অবহেলায় হারিয়ে যেতে বসা এক অন্য অধ্যায়।
ইতিহাসের পাতা বলছে, ১৮৭৪ সালে গজলডোবায় চা-বাগানের হাত ধরেই ডুয়ার্সে চা শিল্পের গোড়াপত্তন হয়েছিল। ইংরেজ আমলের শুরুর সেই দিনগুলিতে জঙ্গল কেটে চা-বাগান তৈরির কাজ পরিচালনা করতেন ব্রিটিশ এবং ইউরোপিয়ান সাহেবরাই। সেই যুগে ম্যালেরিয়া বা কালাজ্বরের মতো ভয়ঙ্কর রোগের প্রাদুর্ভাব ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। সাহেব বা তাঁদের পরিবারের কারও মৃত্যু হলে মরদেহ সুদূর ইংল্যান্ডে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব ছিল। সেই কারণেই চাইবাসার এই মনোরম স্থানে তাঁদের শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হতো।
এককালে সুন্দর সীমানা প্রাচীর আর নিখুঁত কারুশিল্পে মোড়া এই সমাধিস্থলটি দেখতে অনেকটা শান্তির উদ্যানের মতো ছিল। প্রতিটি কবরে খোদাই করা থাকত প্রয়াত সাহেবদের নাম, জন্ম ও মৃত্যুর তারিখের মতো নানা তথ্য। রাঙামাটি চা-বাগানের ব্রিটিশ ম্যানেজার ডব্লিউ ডি কৌলের স্ত্রী মারিয়াম ইডা থেকে শুরু করে আইভিল চা-বাগানের ফ্রেডরিক্স চার্লস জর্ডন কিংবা উইলিয়াম কসের মতো তরুণ সাহেবদের শ্বেতপাথরের মূর্তিখচিত সৌধ একসময় এই জমির মুকুট ছিল। এমনকি উইলিয়াম কসের কবরে ইংরেজিতে খোদাই করা কবিতার পঙক্তি আজও সেই অতীতের কথা মনে করিয়ে দেয়।
অথচ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেই ঐতিহ্য আজ পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে। স্থানীয় বাসিন্দাদের আক্ষেপ, বহু মূল্যবান পাথর চুরি হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ভেঙে পড়েছে সীমানা প্রাচীর। ঐতিহাসিক এই সম্পদকে বাঁচিয়ে রাখতে স্থানীয় মানুষ থেকে শুরু করে বিশিষ্টজনেরা বহুবার প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ দাবি করলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
মালবাজারের পরিমল মিত্র স্মৃতি মহাবিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক স্বপনকুমার ভৌমিকের মতে, ডুয়ার্সের চা শিল্পের উৎপত্তির ইতিহাস জানতে এই সমাধিস্থলের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই দ্রুত রক্ষণাবেক্ষণ করে এটিকে পর্যটন মানচিত্রে তুলে ধরা এখন সময়ের দাবি। ডুয়ার্সের এই ঐতিহাসিক নিদর্শন শেষ পর্যন্ত সংরক্ষণের আলো দেখবে কি না, এখন সেটাই দেখার।