কোমরে রিভলভার, হাতে চাবুক আর মুখে জ্বলন্ত সিগার! ইংরেজদের ত্রাস সেই ‘হান্টারওয়ালি’র ইতিহাস আজ কোথায় হারাচ্ছে?

কোমরে রিভলভার, হাতে চাবুক আর মুখে জ্বলন্ত সিগার: ব্রিটিশদের ত্রাস সেই ‘হান্টারওয়ালি’ বিমলা প্রতিভার হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস
সিমেন্টের ফলকে লেখা রয়েছে নাম, রয়েছে রাস্তার একটি বোর্ডও। কিন্তু তাতে স্পষ্ট ফাটলের রেখা। রোদে-জলে পুড়ে জং ধরা বোর্ডের সেই লেখা আজ প্রায় মলিন। আসানসোলের প্রান্তিক এলাকা সূর্যনগর-ঢাকেশ্বরীতে ঢুকলে চোখে পড়বে ‘বিমলা প্রতিভা সরণি’র এই ফলক। অথচ, স্বাধীন ভারতের ইতিহাসের পাতায় বা আজকের প্রজন্মের কাছে প্রায় অচেনাই রয়ে গিয়েছেন এই ডাকাবুকো নারী— আসানসোলের স্বাধীনতা সংগ্রামী বিমলা প্রতিভা বিশ্বাস, একসময় যাঁকে বলা হতো ‘হান্টারওয়ালি’।
ঘোড়া ছুটিয়ে সাহেবদের শায়েস্তা করা বীরাঙ্গনা
১৯০১ সালের ডিসেম্বর মাসে ওড়িশার কটকে জন্ম নেন বিমলা। বাবা সুরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ছিলেন স্বদেশি আন্দোলনের সমর্থক। ছোট থেকেই বিপ্লবীদের গল্প শুনে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হন তিনি। কলকাতার এক বনেদি পরিবারে বিয়ে হলেও ঘর-সংসারের গণ্ডি তাঁকে আটকে রাখতে পারেনি। ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটাতে অহিংস আন্দোলনের পাশাপাশি সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের পথ বেছে নেন তিনি।
খোদ ভগৎ সিংয়ের নওজওয়ান সভায় যোগ দিয়ে বন্দুক চালানোর প্রশিক্ষণ নেন বিমলা। পরবর্তীতে বামপন্থী শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে চলে আসেন রানিগঞ্জে। কয়লাখনির শ্রমিকদের বস্তিতে থেকে ঘোড়ায় চড়ে খনি এলাকায় ঘুরে বেড়াতেন তিনি। কোমরে গোঁজা রিভলভার, হাতে চাবুক আর ঠোঁটে জ্বলন্ত সিগার— শ্রমিকদের উপর ব্রিটিশ সাহেবদের অত্যাচারের খবর পেলেই সেখানে পৌঁছে যেতেন এই ‘হান্টারওয়ালি’। তাঁর রণমূর্তি দেখলে তটস্থ হয়ে উঠত ব্রিটিশ পুলিশ।
একাধিকবার কারাবাস ও সাহিত্যচর্চা
১৯৩০ সালের কুমিল্লার ম্যাজিস্ট্রেট হত্যা মামলা এবং ১৯৩১ সালের উল্টোডাঙায় ডাকাতি মামলায় নাম জড়ানোয় একাধিকবার গ্রেপ্তার হন বিমলা। দীর্ঘ কারাবাসের জেলের ভেতরেই তিনি লেখেন তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘নতুন দিনের আলো’। পরবর্তীকালে প্রকাশিত হয় তাঁর আরও এক বই ‘আগুনের ফুলকি’। ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনেও সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন তিনি।
করুণ শেষ অধ্যায় ও অবহেলার চিত্র
দেশ স্বাধীনের পরও শ্রমিকদের অধিকার ও সমাজসেবা থেকে সরে দাঁড়াননি তিনি। জীবনের সায়াহ্নে হীরাপুরের ঢাকেশ্বরী-সূর্যনগর এলাকায় দামোদরের ধারের একটি আবাসনে কাটলেও জীবনের শেষ দিনগুলি খুব একটা সুখের ছিল না। সরকারবিরোধী অবস্থানের কারণে জীবনের শেষ লগ্নে অবহেলাতেই নিঃশব্দে বিদায় নেন এই বীরাঙ্গনা।
মৃত্যুর পর তাঁর নামে ঢাকেশ্বরী-সূর্যনগর এলাকায় রাস্তার নামকরণ করা হলেও আজ কালের নিয়মে সেই স্মৃতিও আবছা। রাস্তার ফলকে ফাটল ধরেছে, নতুন প্রজন্ম জানে না তাঁর ব্রিটিশ-বিরোধী সংগ্রামের কথা। সিপিএম নেতা পার্থ মুখোপাধ্যায় জানান, রাস্তার ফলক ভেঙে পড়ার খবর তাঁদের কাছে রয়েছে এবং পুরনিগমের কাছে তাঁর নাম ও স্মৃতি যথাযথভাবে সংরক্ষণের দাবি জানানো হয়েছে। একসময়ে ব্রিটিশদের কাঁপিয়ে দেওয়া সেই ‘হান্টারওয়ালি’র স্মৃতি আজ শুধুই ঝোপঝাড়ের আড়ালে এক নীরব সাক্ষী।