৪০ বছর ধরে যে শূন্যতা তাড়া করছিল, ডিএনএ টেস্টের রিপোর্টে মিলল তার উত্তর! দুই বোনের পুনর্মিলনের অবিশ্বাস্য গল্প

কুম্ভ মেলায় হারিয়ে যাওয়া পরিবারের সদস্যদের ফিরে পাওয়ার গল্প আমরা বহুবার শুনেছি। হয়তো সেগুলোকে অনেকে অলৌকিক বা কাকতালীয় বলে উড়িয়েও দেন। কিন্তু ভারত থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে নেদারল্যান্ডসে ঘটে যাওয়া এই দুই বোনের পুনর্মিলনের গল্প শুনলে আপনি কেবল অবাকই হবেন না, প্রকৃতির অমোঘ নিয়মের সামনে মাথা নত করতে বাধ্য হবেন।
একদম সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায় মীনা গেলটিঙ্ক এবং মিনাল টিজসেনের জীবন। ভারতের এক অনাথ আশ্রমে জন্ম নেওয়া এই দুই বোনকে দত্তক নেয় নেদারল্যান্ডসের দুটি আলাদা ডাচ পরিবার। শৈশবে তাঁরা জানতেনই না যে, তাঁরা একে অপরের সহোদর বোন। তাঁদের আলাদা আলাদা পদবিও হয়। যদিও ভারতের দেওয়া ‘মীনা’ ও ‘মিনাল’ নামটি তাঁদের সঙ্গেই থেকে গিয়েছিল।
কাকতালীয় সাক্ষাৎ ও সেই ‘বন্ধুত্ব’
প্রকৃতির পরিকল্পনায় ১৯৯৬ সালে নেদারল্যান্ডসে দত্তক নেওয়া শিশুদের একটি সম্মেলনে দু’জনের দেখা হয়। একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে জানতে পারেন, দু’জনেরই জন্ম ভারতে। এমনকি নেদারল্যান্ডসে তাঁদের বাড়ির দূরত্বও ছিল মাত্র ১০০ মাইলের কাছাকাছি। একে অপরের সঙ্গে এত বেশি শারীরিক মিল ছিল যে, অন্য শিশুরা তাঁদের বোন বলে মশকরাও করত। কিন্তু সেদিন তাঁরা সেটিকে কেবল বন্ধুত্ব হিসেবেই দেখেছিলেন।
পরবর্তী ১৫ বছর জীবনের ব্যস্ততায় তাঁদের যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। মীনা নিজের সংসারে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, মিনালও পাড়ি জমান ফ্রান্সে। তবে এত বছর ধরে দুজনেই মনে মনে এক অদ্ভুত শূন্যতা অনুভব করতেন। যেন মনের কোনো এক কোণে ধাঁধার একটি টুকরো হারিয়ে গিয়েছিল।
ডিএনএ টেস্টে মিলল সত্যের সন্ধান
সব রহস্যের সমাধান মেলে ২০২৬ সালের এপ্রিলে। মিনাল ‘মাই হেরিটেজ’-এর একটি ডিএনএ পরীক্ষা করান। ফোনে যখন পরীক্ষার ফলাফল আসে, তখন মীনা ও মিনাল—দুজনই হতবাক। রিপোর্টে লেখা ছিল ‘সিস্টার’। প্রথমে বিশ্বাস না হলেও, সোশ্যাল মিডিয়ায় একে অপরের ছবি দেখার পর পুরনো স্মৃতি নতুন রূপ নেয়। ডিএনএ পরীক্ষায় তাঁদের মিল পাওয়া যায় ১০০ শতাংশ।
সম্প্রতি ১১ আগস্ট নেদারল্যান্ডসে যখন দুজনে প্রথমবার বোন হিসেবে দেখা করেন, তখন চোখের জলে আর হাসিতে এক আবেগঘন মুহূর্ত তৈরি হয়। একে অপরকে জড়িয়ে ধরে মীনা বলেন, “তোমাকে দেখলে মনে হয়, আমি অবশেষে বাড়ি ফিরে এলাম।”
মিনাল আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, “আমরা প্রথমে বন্ধু ছিলাম, পরে বোন হয়েছি, কিন্তু আসলে আমরা সবসময়ই বোন ছিলাম, শুধু জানতাম না।” বর্তমানে দুই বোন প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলে সেই হারিয়ে যাওয়া বছরগুলোর অভাব পূরণ করছেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে, আমরা অনেক সময় যা খুঁজে বেড়াই, তা আসলে আমাদের চোখের সামনেই থাকে, শুধু পরিচয়টা জানা বাকি থাকে। তাঁদের কাছে এই পুনর্মিলন কেবল আনন্দের নয়, বরং বহু বছর ধরে বয়ে বেড়ানো একাকিত্বের সমাপ্তি।