ঘর থেকে বের হতে পারছেন না অর্ধেক আফগান মহিলা, নারী স্বাধীনতা নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য

আফগানিস্তানে তালেবান সরকারের নানামুখী কঠোর বিধিনিষেধের কারণে স্বাধীনভাবে চলাচল এবং সামাজিক জীবনে নারীদের অংশগ্রহণ আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশটির প্রায় অর্ধেক নারী মাসে মাত্র এক বা দু’বার ঘর থেকে বের হওয়ার সুযোগ পান। বুধবার জাতিসংঘের নারীবিষয়ক সংস্থা ‘ইউএন উইমেন’-এর প্রকাশিত এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ তথ্য সামনে এসেছে।

ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, চলতি মাসেই আফগানিস্তানের ক্ষমতায় দ্বিতীয় দফায় তালেবানের প্রত্যাবর্তনের পাঁচ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। এই উপলক্ষেই লিঙ্গ সমতা নিয়ে কাজ করা জাতিসংঘের ওই অঙ্গসংস্থা বিশেষ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানই বর্তমানে বিশ্বের একমাত্র দেশ, যেখানে মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা এবং নারীদের উচ্চশিক্ষার ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে।

জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে তালেবান পুনরায় ক্ষমতা দখল করার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ২৪ লাখ আফগান কিশোরী মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হয়েছে। ইউএন উইমেনের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গত পাঁচ বছরে তালেবান সরকার অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে তাদের দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার হরণ করেছে, যা আধুনিক বিশ্বে এক নজিরবিহীন ঘটনা।

সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, ক্ষমতা দখলের পর থেকে এ পর্যন্ত নারী ও মেয়েদের লক্ষ্য করে একশোরও বেশি কঠোর নীতি ও আদেশ জারি করেছে তালেবান প্রশাসন। এর মাধ্যমে নারীদের ওপর বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে, যা বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ নারী অধিকার সংকটে পরিণত হয়েছে। সংস্থার সাম্প্রতিক জরিপে অংশ নেওয়া অর্ধেকেরও বেশি নারী জানিয়েছেন, তারা মাসে দু’বার বা তার চেয়েও কম সময়ে বাইরে যাওয়ার সুযোগ পান। পাশাপাশি প্রায় তিন-চতুর্থাংশ নারী বলেছেন, পরিবারের কোনো পুরুষ অভিভাবক বা মাহরাম ছাড়া ঘরের বাইরে পা রাখতে তাঁরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।

এই লাগাতার আইনি ও সামাজিক কড়াকড়ির মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে আফগান নারীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর। তীব্র একাকীত্ব, সুযোগের অভাব এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার শিকার হয়ে জরিপে অংশ নেওয়া প্রতি ১০ জন নারীর মধ্যে ৭ জনই তাঁদের বর্তমান মানসিক অবস্থাকে খারাপ বা অত্যন্ত খারাপ বলে বর্ণনা করেছেন। বিশেষ করে চলতি বছর কার্যকর হওয়া নতুন কিছু নিয়মের মাধ্যমে আইনের চোখে নারী-পুরুষের সমান অধিকার বাতিল করা হয়েছে, বৈবাহিক সম্পর্কে পুরুষের একক কর্তৃত্ব বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং নারীদের জন্য তালাক নেওয়ার পথ অত্যন্ত কঠিন করে তোলা হয়েছে।

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকেও নারীদের প্রায় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। ইউএন উইমেনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটিতে কর্মক্ষম পুরুষের ৮৪ শতাংশ কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও নারীদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৭ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ এবং ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে মে মাসের মধ্যে পরিচালিত সরেজমিন জরিপ ও টেলিফোন সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে।

এদিকে নারীদের নিরাপত্তা ও চলাফেরা সংক্রান্ত জাতিসংঘের এই সমস্ত দাবি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে আফগান সরকার। তালেবানের সদাচার প্রচার ও পাপ প্রতিরোধ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাইফ-উল-Islam খাইবার রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, নারীরা বাইরে বের হতে অনিরাপদ বোধ করছেন—এমন তথ্য একেবারেই সঠিক নয়। তাঁর দাবি, দেশের সব নারীই বর্তমানে তাঁদের সমস্ত প্রাপ্য অধিকার নির্বিঘ্নে ভোগ করছেন। গত প্রায় ৫০ বছরের মধ্যে এই প্রথম আফগানিস্তানের সব নাগরিক পরম নিরাপত্তা ও শান্তিতে বসবাস করছেন বলেও দাবি করেন তিনি। পাশাপাশি তালেবানের যুক্তি, তারা ইসলামি শরিয়াহ আইন এবং স্থানীয় আফগান সংস্কৃতির নিজস্ব ব্যাখ্যা অনুসারেই নারীদের অধিকার প্রদান করে আসছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *