যুদ্ধের মোড় ঘোরাল আমেরিকা: তেলের রক্তক্ষরণ ঘটিয়ে কি হাঁটু গেড়ে বসবে ইরান?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলা দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এবার এক সম্পূর্ণ নতুন মোড় নিয়েছে। সরাসরি বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে তেহরানের অর্থনীতির মূলোৎপাটন করতে অর্থনৈতিক চাপের পথ বেছে নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমাবর্ষণের পর এখন ইরানের তেল, নৌপরিবহন এবং ব্যাংকিং নেটওয়ার্ককে প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে আমেরিকা।

১. কেন কৌশল বদলাচ্ছে আমেরিকা?

দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযানের কারণে আমেরিকার বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও আর্থিক সম্পদ খরচ হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ দীর্ঘায়িত না করে, তেহরানের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়ে তাদের আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করাটাই ট্রাম্প প্রশাসনের মূল লক্ষ্য। ইরানের আয় ব্যাপকভাবে কমিয়ে দিতে পারলে দেশটির পক্ষে সামরিক শক্তি বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।

২. তেলের রক্তক্ষরণ ও চিনের ভূমিকা

ইরানি অর্থনীতির প্রধান জীবনরেখা হলো তেল। মার্কিন কৌশলের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো আন্তর্জাতিক বাজারে ইরানের তেল সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া। তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে চিন।

  • ইউএস-চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড সিকিউরিটি কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের মোট রপ্তানিকৃত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই কিনে নেয় চিন, বিশেষ করে চিনের ছোট ও স্বাধীন তেল শোধনাগারগুলো।

  • মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরান একটি গোপন ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা ছায়া নৌবহর ব্যবহার করছে, যার মাধ্যমে তেল ও ক্রেতাদের আসল পরিচয় সুকৌশলে গোপন করা হয়।

  • চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও, ২০২৬ সালের মার্চ মাসে ইরান প্রতিদিন প্রায় ১.১৩৬ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে, যার বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৩.৬৩ বিলিয়ন ডলার

৩. ব্যাংকিং ও জাহাজ চলাচলের ওপর সর্বাত্মক কড়াকড়ি

শুধু তেল বাণিজ্যই নয়, ইরানের আন্তর্জাতিক লেনদেন পঙ্গু করতে তাদের ব্যাংকিং খাত, বৈদেশিক মুদ্রা এবং সামুদ্রিক নেটওয়ার্কের ওপর খড়্গহস্ত হয়েছে ওয়াশিংটন। এর মূল উদ্দেশ্য হলো তেল বিক্রি থেকে আসা অর্থ আন্তর্জাতিক বাজারে লেনদেন করার পথ চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া।

৪. হরমুজ প্রণালীই এখন সবচেয়ে বড় বাজি

এই গোটা ভূ-রাজনৈতিক খেলায় সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালী। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান অচলাবস্থার জেরে ইতিমধ্যে বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় রকমের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেল প্রতি ব্যারেল ৮৮ ডলারে এবং ডব্লিউটিআই অপরিশোধিত তেল ঊর্ধ্বমুখীপর্যায়ে পৌঁছেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চিনের অদৃশ্য সমর্থন এবং ইরানের বিকল্প বাণিজ্য নেটওয়ার্ক ভেদ করে ট্রাম্পের এই অর্থনৈতিক কৌশল কতটা সফল হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *