বর্ষায় হাত ছোঁয়ালেই ছ্যাঁকা! ভরা মরসুমেও কেন নাগালের বাইরে ইলিশের দাম? জানুন কারণ

একসময় বর্ষা মানেই ছিল পাতে গরম ভাত আর ধোঁয়া ওঠা ইলিশ ভাপা বা সর্ষে ইলিশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চেনা ছবিটা পুরোপুরি বদলে গিয়েছে। এখন মধ্যবিত্তের কাছে ইলিশ খাওয়া একপ্রকার বিলাসিতার সামিল। গোটা বর্ষার মরসুমে বড়জোর দু’-একবার পাতে ঠাঁই হয় ‘মাছের রাজা’র। ২০২৬ সালের এই বর্ষায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। জুনের শেষ থেকেই বাজারে ইলিশের দেখা মিললেও দাম ছিল একেবারে আগুন। আর অগাস্ট মাসে এসেও দাম হ্রাসের বিন্দুমাত্র লক্ষণ নেই। উল্টে এক কেজির কাছাকাছি ওজনের ইলিশ কিনতে পকেট ফাঁকা হওয়ার জোগাড়।
ভরা মরসুমেও কেন এত চড়া দাম ইলিশের? নেপথ্যে কি শুধু কম মাছ ধরা পড়া, নাকি লুকিয়ে রয়েছে অন্য কোনও বড় কারণ? একনজরে দেখে নেওয়া যাক বিশদ তথ্য।
কলকাতার বাজারে ইলিশের বর্তমান দর
শহরের বিভিন্ন বাজারে এখন মূলত ৯০০ গ্রাম থেকে ১.১ কেজি ওজনের ইলিশের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এই সাইজের মাছের প্রতি কেজির দাম ঘোরাফেরা করছে ১,০০০ থেকে ১,১২০ টাকার মধ্যে। এছাড়া ১.২ থেকে ১.৩ কেজি ওজনের বড় সাইজের ইলিশের দাম সোজা পৌঁছে গিয়েছে ১,৫০০ থেকে ১,৬০০ টাকা পর্যন্ত। ৭০০ থেকে ৯০০ গ্রামের মাঝারি ইলিশের দামও ৯০০ থেকে ১,০০০ টাকার আশপাশে আটকে রয়েছে। কিছুটা কম দামের (৫০০-৬০০ গ্রাম) ছোট ইলিশ পাওয়া গেলেও ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, তার বেশিরভাগই হিমঘরের (Cold Storage), যার স্বাদ টাটকা ইলিশের ধারেকাছেও আসে না।
দাম আকাশছোঁয়া হওয়ার আসল কারণগুলি কী কী?
-
আবহাওয়া ও ট্রলারের সমস্যা: মাছ ব্যবসায়ীদের মতে, এই চড়া দামের প্রধান কারণ প্রতিকূল আবহাওয়া। দক্ষিণবঙ্গের উপকূল সংলগ্ন বঙ্গোপসাগর বারবার উত্তাল হয়ে উঠছে। এর ফলে ট্রলারগুলি সমুদ্রে দীর্ঘ সময় টিকতে পারছে না। অনেক ক্ষেত্রেই মাত্র দু’-তিন দিনের মধ্যে নামমাত্র মাছ নিয়ে উপকূলে ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছেন জেলেরা। ফলস্বরূপ, বাজারে জোগান মারাত্মকভাবে কমেছে, কিন্তু চাহিদা একই থাকায় দাম হু হু করে বাড়ছে।
-
বাংলাদেশের উৎপাদন সংকট: সমস্যা শুধু ভারতেই নয়। এ বছর বাংলাদেশের উপকূলেও জালে আশানুরূপ ইলিশ ধরা পড়ছে না বলে সেখানকার গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। জেলেদের অভিযোগ, নদীতলদেশে পলি জমা, নতুন চর জেগে ওঠা এবং সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তনের কারণে ইলিশের স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি ব্যাহত হচ্ছে। অতিরিক্ত মাছ ধরার ফলে প্রজননের সুযোগ না পাওয়ায় জলে মাছের সংখ্যাও সামগ্রিকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
-
রফতানি নিয়ে অনিশ্চয়তা: প্রতি বছর দুর্গাপুজোর আগে পদ্মার রূপোলি ইলিশের অপেক্ষায় থাকেন এপার বাংলার খাদ্যরসিকরা। কিন্তু এ বছর খোদ বাংলাদেশেই উৎপাদন কম থাকায় ভারতে রফতানি নিয়ে বড়সড় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এখনও পর্যন্ত এই বিষয়ে সরকারিভাবে কোনও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
সমাধান কোথায়?
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে ইলিশের এই সংকট কাটাতে হলে মা ইলিশ এবং জাটকা (ছোট ইলিশ) সংরক্ষণে প্রশাসনকে আরও কঠোর হতে হবে। একই সঙ্গে আবহাওয়া পুরোপুরি অনুকূলে এলে সমুদ্রে ট্রলারের মাছ ধরার দিন বাড়বে, বাজারে জোগান বাড়বে এবং দামও কিছুটা নাগালের মধ্যে আসতে পারে। তবে ততদিন পর্যন্ত বাঙালির চিরকালের এই দুর্বলতা পকেটের জোরের ওপরই নির্ভর করে থাকবে।