ক্ষিদের জ্বালায় বারবার কান্না! চরম ক্ষোভে শিশুকন্যাকে পিটিয়ে মারলেন মা, গুজরাত হাইকোর্টের রায়ে কেঁপে উঠল সমাজ

মাত্র দু’বছরের একটি অবুঝ শিশু। বারবার শুধু একটাই আকূতি—”তার খিদে পেয়েছে।” কিন্তু অভাবের তাড়নায় জর্জরিত সেই পরিবারে খাবার জোগাড় করাটাই ছিল বিলাসিতা। অভিযোগ, অনাহার আর চরম ক্ষুধার জ্বালায় অবিরত কান্নাকাটি করায় রাগের মাথায় নিজের শিশুকন্যাকে এমন মারধর করেন মা, যার জেরে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগেই সব শেষ। চলতি বছরের মার্চ মাসে গুজরাতের সুরতের ভারাছা এলাকার এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় অভিযুক্ত মা লখিবেন সোলাঙ্কিকে জামিন দিয়েছে গুজরাত হাইকোর্ট। তবে এই মামলার রায় দিতে গিয়ে আদালত যা পর্যবেক্ষণ করেছে, তা গোটা সমাজ, রাষ্ট্র এবং মানবিকতার সামনে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়েছে।
মর্মান্তিক ঘটনার নেপথ্যে চরম দারিদ্র্য
পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে, অভিযুক্ত লখিবেন সোলাঙ্কি তিন সন্তানের মা। দীর্ঘদিন ধরেই পরিবারটি চরম আর্থিক অনটনের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিল। সংসারে নিয়মিত আয়ের কোনও স্থায়ী উৎস না থাকায় খাবার জোটানোই ছিল তাদের প্রতিদিনের মারণ লড়াই। ঘটনার দিন দু’বছরের মেয়ে ঈশা বারবার খাবারের জন্য জেদ করতে শুরু করে এবং দীর্ঘক্ষণ ধরে কাঁদতে থাকে। চরম মানসিক চাপ ও ক্ষোভের বশেই মা শিশুটির উপর হাত তোলেন।
কিছুক্ষণের মধ্যেই শিশুটি অচেতন হয়ে পড়ে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে অভিযুক্ত মা নিজেই প্রতিবেশীদের সাহায্যে মেয়েকে হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু চিকিৎসকেরা জানান, অনেক আগেই শিশুটির মৃত্যু হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়ার পর পুলিশ ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ধারায় মামলা রুজু করে মাকে গ্রেফতার করে।
কী জানাল গুজরাত হাইকোর্ট?
জামিনের আবেদন শুনানিতে বিচারপতি হসমুখ ডি. সুথার তাঁর ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছেন যে, মামলার নথি অনুযায়ী অভিযুক্ত নিজেই মেয়েকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন। তদন্তের এই পর্যায়ে এমন কোনও প্রমাণ মেলেনি যা থেকে প্রমাণিত হয় যে তিনি পূর্বপরিকল্পিতভাবে সন্তানকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন। বরং আদালতের মতে, দীর্ঘদিনের দারিদ্র্য, অনাহার এবং চরম অসহায় পরিস্থিতির ফলেই এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।
বিচারপতি অত্যন্ত জোরালোভাবে বলেন, “ক্ষুধা যখন একজন মাকে নিজের সন্তানের উপর হাত তুলতে বাধ্য করে, তখন শুধু সেই মাকে দোষী বললেই সমাজের দায় এড়ানো যায় না। এটি আমাদের সামাজিক ও কল্যাণমূলক ব্যবস্থার ব্যর্থতারও প্রতিচ্ছবি।” আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, অপরাধকে কখনই সমর্থন করা যায় না, কিন্তু তার পেছনের নির্মম সামাজিক বাস্তবাকেও উপেক্ষা করা যায় না।
সাহিত্য ও দর্শনের উদাহরণ
রায়ে বিচারপতি সাহিত্য ও দর্শনের একাধিক গভীর উদ্ধৃতি টেনে আনেন। গুজরাতি সাহিত্যিক পান্নালাল প্যাটেলের বিখ্যাত উপন্যাস ‘মানভিনি ভাবাই’, ফরাসি সাহিত্যিক ভিক্টর হুগোর ‘Les Misérables’, এমনকি ভগবদ্গীতা, বাইবেল এবং ইসলামি ধর্মগ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, ক্ষুধা মানুষের বিবেক ও আচরণকে কতটা গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে। তাই এই ধরনের ঘটনাকে কেবল আইনের সংকীর্ণ গণ্ডিতে না দেখে মানবিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিচার করা প্রয়োজন।
আদালত যদিও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে জামিন মানেই অভিযুক্তের নির্দোষ প্রমাণ নয় এবং আইন অনুযায়ী বিচার চলবে, তবুও এই রায় আমাদের এক কঠিন আয়না দেখিয়েছে। স্বাধীনতার আট দশক পরও যদি একটি শিশু শুধুমাত্র একটু খাবারের জন্য কাঁদতে কাঁদতে প্রাণ হারায়, তবে সেই ব্যর্থতার দায় কার? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো বিচারব্যবস্থার রায়ে পুরোপুরি মিলবে না, তবে ঈশার মৃত্যু আবারও প্রমাণ করল যে ক্ষুধা কেবল একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি মানবতা ও রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার এক চরম পরীক্ষা।