‘ওরা আমাদেরই সন্তান, ওরা প্রশ্ন করতে জানে!’ আন্দোলনরত জেন জি-র প্রশংসায় পঞ্চমুখ আরএসএস প্রধান

আন্দোলন বা প্রতিবাদ করলেই নতুন প্রজন্মকে ‘দেশবিরোধী’ (Anti-National) দেগে দেওয়ার যে প্রবণতা সমাজে দেখা যায়, তার তীব্র সমালোচনা করলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (RSS) প্রধান মোহন ভগবত। বৃহস্পতিবার মুম্বইয়ে এক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, আজকের ‘জেন জি’ (Gen Z) বা নতুন প্রজন্ম যদি নিজেদের অধিকারের দাবিতে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানায়, তার মানে এই নয় যে তারা দেশের শত্রু। তাঁরা আমাদেরই সন্তান এবং দেশের ভবিষ্যৎ।

জেন জি ও নতুন প্রজন্মের প্রশংসায় সঙ্ঘ প্রধান
বর্তমান প্রজন্মের মানসিকতা ও চিন্তাভাবনার প্রশংসা করে মোহন ভগবত বলেন, “আমরা যখন তাঁদের বয়সে ছিলাম, তখন প্রবীণদের কথা চোখ বন্ধ করে মেনে নিতাম। প্রশ্ন করার সেই সাহস বা মানসিকতা আমাদের ছিল না। কিন্তু আজকের জেন জি সবকিছু যুক্তিসহ বুঝতে চায়। না বুঝে কোনো কিছু তারা সহজে মেনে নিতে প্রস্তুত নয়।”

তিনি আরও যোগ করেন, “যদি জেন জি কোনো বিষয়ে প্রতিবাদ জানায়, তবে তারা দেশবিরোধী—এমন ভাবা একেবারেই ভুল। তারা আমাদেরই পরিবারের সন্তান, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, আমাদের প্রজন্মের চেয়ে এই নতুন প্রজন্ম—জেন জি এবং জেন আলফা (Gen Alpha)—অনেক বেশি সৎ। দেশপ্রেম ও দেশসেবার প্রকৃত বার্তা ওদের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে।”

নিট আন্দোলনে পুলিশি লাঠিচার্জ নিয়ে উদ্বেগ
সম্প্রতি দিল্লিতে ‘নিট’ (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস কাণ্ডকে কেন্দ্র করে যন্তর মন্তরে হাজার হাজার শিক্ষার্থী প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিল, যাদের সিংহভাগই ছিল এই জেন জি প্রজন্মের। গত ২০ জুলাই সেই ছাত্র আন্দোলনে পুলিশি লাঠিচার্জ এবং টিয়ার গ্যাস ও পেলেট গান ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে।

সেই প্রসঙ্গ টেনে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে মোহন ভগবত প্রশ্ন তোলেন, “কেন তরুণ শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ করতে হলো? কেন পেলেট গান ব্যবহার করা হলো? এর পেছনে আসল কারণ কী, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।”

শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ ও বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি
দেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের পক্ষে জোরালো সওয়াল করে সঙ্ঘ প্রধান জানান, দু-একটি ছোটখাটো পরিবর্তন এনে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়।

শিক্ষা কোনো ব্যবসা নয়: তাঁর সাফ কথা, শিক্ষা কোনো বাণিজ্যিক পণ্য বা ব্যবসা নয়। দেশের প্রতিটি প্রান্তের প্রতিটি শিশুর কাছে মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ পৌঁছে দেওয়া সমাজের নৈতিক দায়িত্ব। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির ফি কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা অত্যন্ত জরুরি।

বাজেটে ৬ শতাংশ বরাদ্দ: ভারতের সামগ্রিক বাজেটে শিক্ষার জন্য বরাদ্দ বাড়িয়ে মোট বাজেটের অন্তত ৬ শতাংশ করার দাবিকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে শিক্ষকদের মানসম্মত প্রশিক্ষণ এবং স্কুলগুলির উন্নয়নে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপরও জোর দিয়েছেন তিনি।

পাকিস্তান ও চিন প্রসঙ্গে তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য
আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন আরএসএস প্রধান। পাকিস্তান ও চিনকে চিরকালের বা ‘স্থায়ী শত্রু’ হিসেবে দেখতে নারাজ তিনি।

মোহন ভগবতের ভাষায়, “দুটি দেশের মধ্যে কোনো বিষয় নিয়ে সংঘাত দেখা দিলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সাময়িকভাবে স্থগিত হতে পারে, কিন্তু তা চিরতরে শেষ হয়ে যেতে পারে না। পাকিস্তান বা চিন যে মন থেকে চিরকালের শত্রু, বিষয়টি তেমন নয়। এর পেছনে আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও রাষ্ট্রীয় রাজনীতির বহুমুখী ভূমিকা থাকে।”

সংকট বা যুদ্ধের সময়ে দেশের সরকারের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানোর বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, “দেশের সংকটকালে আমরা সর্বদা সরকারের সঙ্গে থাকি, কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের মনে রাখা দরকার যে চূড়ান্ত বিচারে মানবতাই সর্বশ্রেষ্ঠ এবং আমরা সবাই এক।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *