হরমুজ প্রণালী নিয়ে বড় মোড়! ওমানের সঙ্গে নতুন সামুদ্রিক চুক্তির পথে ইরান, আমেরিকার সঙ্গে তুঙ্গে সংঘাত

বিশ্বের অন্যতম অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ— হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) নিয়ে ফের আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। ইরান নতুন করে দাবি করেছে যে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য একটি নতুন বিকল্প সমুদ্রপথ তৈরি করতে তারা ওমান সরকারের সঙ্গে প্রায় একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে। বর্তমানে এই চুক্তিটি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছে তেহরান। তবে একই সঙ্গে ইরান অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও তা ওই অঞ্চলে সামুদ্রিক নিরাপত্তার কোনো সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা দেয় না। উল্টোদিকে, মার্কিন নৌ-অবরোধ এবং ওয়াশিংটনের আগ্রাসী সামরিক কার্যকলাপকেই এই অঞ্চলে চরম উত্তেজনার মূল কারণ বলে দেগে দিয়েছে ইরান।

ওমানের সঙ্গে চুক্তি ও ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই জানিয়েছেন যে, নতুন এই সমুদ্রপথ নির্ধারণের বিষয়ে ওমানের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। দুই দেশ ইতিমধ্যে এই রুটের নির্দিষ্ট ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক বা কো-অর্ডিনেটসের (Geographical Coordinates) বিষয়েও একমত হয়েছে। তবে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ কোনো আইনি বা প্রযুক্তিগত বিবরণ এখনও প্রকাশ করা হয়নি।

ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদী রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থাকে জানিয়েছেন যে, ওমানের সঙ্গে সম্মত হওয়া এই নতুন সমুদ্রপথটি সম্পূর্ণ অস্থায়ী প্রকৃতির হবে এবং এটি বড়জোড় দুই থেকে চার মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রস্তাবিত এই বিশেষ ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হলে পারস্য উপসাগরে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলির ওপর ইরানের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ আরও অনেক বেশি বৃদ্ধি পাবে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ও ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি
ইসমাইল বাকাই সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, এই নতুন চুক্তির পরেও হরমুজ প্রণালীকে পুরোপুরি নিরাপদ বা বিপদমুক্ত বলে গণ্য করা যায় না। কারণ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনও ইরানের বিভিন্ন প্রধান বন্দরগুলিতে কঠোর নৌ-অবরোধ বজায় রেখেছে। ওয়াশিংটনের আগ্রাসী সামরিক পদক্ষেপ ও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ফলেই বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্য মার খাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে তেহরান। যদিও ইরানের এই দাবি বা প্রস্তাবের বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ওমান সরকারের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।

এদিকে চলতি সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে, হরমুজ প্রণালী অবিলম্বে পুরোপুরি খুলে দেওয়া না হলে ইরানকে চরম ও গুরুতর পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। যদিও মার্কিন কর্মকর্তারা এর আগে আলোচনার অগ্রগতির ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তবে ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে যে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধরনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ আলোচনায় অংশ নিচ্ছে না।

কেন বন্ধ হয়েছিল হরমুজ প্রণালী? মূল বিরোধ ট্রানজিট ফি
গত ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানের ওপর মার্কিন ও ইসরায়েলি যৌথ সামরিক হামলার পর থেকেই তেহরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর অত্যন্ত কড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। যদিও পরবর্তীতে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির সুবাদে রুটটি কিছুদিনের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল, তবে জুলাই মাসে দুই দেশের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা পুনরায় বৃদ্ধি পাওয়ায় ইরান আবারও এই গুরুত্বপূর্ণ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা ফিরিয়ে আনে। উল্লেখ্য, এই রুটটি বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল ও এলএনজি বাণিজ্য পথ, যেখান দিয়ে বৈশ্বিক শক্তির প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহ করা হয়।

বর্তমানে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিরোধ বা বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘ট্রানজিট চার্জ’ বা ফি (Transit Fee)। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী:

ইরানের দাবি: তেহরান চাইছে এই প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী প্রতিটি বাণিজ্যিক জাহাজ তাদের মোট কার্গোর ৫ থেকে ৭ শতাংশ অর্থ ফি হিসেবে প্রদান করুক।

ওমানের অবস্থান: ওমান পক্ষ থেকে প্রায় ৩ শতাংশ ফি নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান: অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো ধরনের ট্রানজিট ফি আদায়ের ঘোর বিরোধী।

বিশ্ব অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র এই হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট এই নতুন ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব আগামী দিনে কোন মোড় নেয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে গোটা বিশ্ব।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *