টুলু মণ্ডলের সাম্রাজ্য বাড়তেই চোখ কপালে তদন্তকারীদের! ২০০ কোটির সম্পত্তি ও জাল ডিসিআর কারখানার সন্ধান

রাজ্যের গণ্ডি পেরিয়ে আর্থিক দুর্নীতির আরও এক চাঞ্চল্যকর ও বিশাল অধ্যায়ের পর্দাফাঁস হলো। বেআইনি কারবারের মাধ্যমে গড়ে ওঠা বিতর্কিত ব্যবসায়ী নাজিবুদ্দিন মণ্ডল ওরফে টুলু মণ্ডলের বাজেয়াপ্ত করা সম্পত্তির পরিমাণ ইতিমধ্যেই ২০০ কোটি টাকার গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে। নগদ টাকা, সোনা ও স্থাবর সম্পত্তি মিলিয়ে মোট ২২০ কোটিরও বেশি সম্পত্তির সন্ধান পেয়ে রীতিমতো চোখ কপালে উঠেছে তদন্তকারীদের। শুধু তাই নয়, টুলু মণ্ডল ও তাঁর পরিবারের সদস্য ও বিভিন্ন কোম্পানির নামে প্রায় চারশো বিঘারও বেশি জমির হদিশ মিলেছে। এই বিশাল অপরাধ সাম্রাজ্য গড়ার পেছনে মূল হাতিয়ার ছিল সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে তৈরি জাল ডিসিআর (DCR) বা ডুপ্লিকেট রিসিপ্ট। আর এবার সেই জাল দলিল ছাপানোর গোপন কারখানারই সন্ধান পেল পুলিশ।
পার্কিং লটে অভিযান ও গোপন ছাপাখানা উদ্ধার
গত রবিবার গভীর রাতে তদন্তকারী আধিকারিকরা টুলু মণ্ডলের একটি সুবিশাল পার্কিং লটে অভিযান চালান। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, এই পার্কিং লটের ভেতরে থাকা সিমেন্টের একটি গোডাউনের মধ্যে বস্তা চাপা দেওয়া অবস্থায় অত্যন্ত গোপনে রাখা ছিল ওই ছাপাখানার যন্ত্রটি। মেশিনটি সম্পূর্ণ খোলা অবস্থায় উদ্ধার হওয়ায় তদন্তকারীদের মনে জোরালো সন্দেহ তৈরি হয়েছে যে, এটিকে খুব শীঘ্রই অন্য কোথাও সরিয়ে ফেলার পরিকল্পনা করছিল অভিযুক্তরা। মূলত এই পার্কিং লটটিকেই টুলু তাঁর সমস্ত বেআইনি কারবারের মূল ডেরা বা হেডকোয়ার্টার হিসেবে ব্যবহার করতেন বলে অনুমান করা হচ্ছে।
৩৩ কোটির এফডি ও ম্যানেজার গ্রেফতার
তদন্তে নেমে পুলিশ আরও জানতে পেরেছে যে, টুলুর বিভিন্ন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে প্রায় ৩৩ কোটি ৭০ লক্ষ টাকার ফিক্সড ডিপোজিট (FD) গচ্ছিত রয়েছে। বিপুল পরিমাণ এই সম্পত্তির খোঁজ মিললেও মূল অভিযুক্ত টুলু মণ্ডল এখনও পুলিশের নাগালের বাইরে রয়েছেন। তবে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের ওপর নজর রেখে বড়সড় সাফল্য মিলেছে।
রবিবার রাতে দীর্ঘ ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদের পর টুলুর ক্রাশার ইউনিটের ম্যানেজার সীতেশ প্রামাণিককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। মহম্মদবাজার থানা সূত্রে খবর, ধৃত সীতেশ এই গোটা অপরাধচক্রের অন্যতম প্রধান অংশ এবং টুলুর বিভিন্ন সিন্ডিকেটের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগের মূল সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করত। তাকে জেরা করে টুলুর বর্তমান আস্তানা এবং বাকি গোপন সম্পত্তির হদিশ পেতে আশাবাদী গোয়েন্দারা।
পুলিশের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ ও কড়া পদক্ষেপ
এদিকে, এই গোটা ঘটনার তদন্তে স্থানীয় পুলিশের একাংশের গাফিলতির অভিযোগও জোরালোভাবে সামনে এসেছে। দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগে মহম্মদবাজার থানার দুই সাব-ইন্সপেক্টর আব্দুল আলিম ও সেনাউর হোসেনকে ক্লোজ করে সিউড়ি পুলিশ লাইনে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। রাজ্যজুড়ে আলোড়ন ফেলে দেওয়া এই আর্থিক কেলেঙ্কারির শিকড় ঠিক কতদূর বিস্তৃত এবং এর নেপথ্যে প্রভাবশালী আর কাদের যোগ রয়েছে, তা খতিয়ে দেখতে এখন জোরকদমে তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ প্রশাসন।