বর্ষায় নবজাতকের ত্বকে মারাত্মক ইনফেকশনের ঝুঁকি! অজান্তেই এই ভুলগুলো করছেন না তো?

গ্রীষ্মের দাবদাহ থেকে স্বস্তি নিয়ে যখন বর্ষার ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে, তখন তা বড়দের স্বস্তি দিলেও নবজাতকের সংবেদনশীল ত্বকের জন্য ডেকে আনে নীরব বিপদ। বড়রা গরমে কেবল আঠালো ভাব বা সামান্য র‍্যাশের মুখোমুখি হলেও, সদ্যোজাত বা জীবনের প্রথম কয়েক সপ্তাহের শিশুদের ক্ষেত্রে হিট র‍্যাশ, ডায়াপার ডার্মাটাইটিস এবং ফাঙ্গাল ইনফেকশনের ঝুঁকি বহুলাংশে বেড়ে যায়। কারণ, এই বয়সে শিশুদের ত্বকের প্রাকৃতিক ব্যারিয়ার বা প্রতিরক্ষামূলক স্তর পুরোপুরি বিকশিত হয় না। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন বাবা-মায়েদের ক্ষেত্রে এটি অন্যতম একটি অবহেলিত ঋতুকালীন স্বাস্থ্য উদ্বেগ।

পুণের মাদারহুড হসপিটালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট নিয়োনাটোলজিস্ট ও পেডিয়াট্রিশিয়ান ডা. তুষার পারিখ (Dr Tushar Parikh) সংবাদমাধ্যম নিউজ নাইন লাইভ-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান যে, বর্ষাকালে নবজাতকের ত্বকের যত্নে সাধারণ সময়ের তুলনায় আলাদা সতর্কতা প্রয়োজন। উচ্চ আর্দ্রতার কারণে শরীর থেকে ঘাম সহজে উবে যেতে পারে না। এর পাশাপাশি ভেজা জামাকাপড়, বেশিক্ষণ ডায়াপার পরে থাকা এবং অতিরিক্ত লেয়ার বা জামা পরানোর ফলে শিশুর ত্বকের সঙ্গে আর্দ্রতা আটকে থাকে, যা চুলকানি এবং ইনফেকশনের আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে। আন্তর্জাতিক নবজাতক পরিচর্যা নির্দেশিকাতেও বলা হয়েছে যে, শিশুদের ত্বক অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং বয়স্কদের তুলনায় বেশি ভেদ্য (permeable) হওয়ায় জন্মের প্রথম সপ্তাহগুলিতে বিশেষ নজরদারি ও মৃদু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা প্রয়োজন।

বর্ষার আবহাওয়া কেন নবজাতকের ত্বকের জন্য কঠিন?
বড়দের মতো শিশুদের ত্বক পুরু নয়; এটি উল্লেখযোগ্যভাবে পাতলা এবং এর আর্দ্রতা ধরে রাখার ক্ষমতাও কম। জন্মের পরে ত্বকের স্বাভাবিক অম্লীয় প্রতিরক্ষামূলক স্তরটি (acidic protective layer) তৈরি হতে সময় নেয়। ফলে পরিবেশগত নানা কারণে তারা খুব সহজেই সংক্রামিত হতে পারে।
বর্ষার স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় ত্বকে আর্দ্রতা আটকে থেকে যে সমস্ত সাধারণ সমস্যার সৃষ্টি করে, সেগুলি হলো:

হিট র‍্যাশ বা ঘামাচি (Miliaria)

প্রস্রাব ও মলের দীর্ঘস্থায়ী সংস্পর্শে হওয়া ডায়াপার র‍্যাশ

ত্বকের ভাঁজে ফাঙ্গাল ইনফেকশন

অতিরিক্ত স্নান বা কড়া সাবানের ব্যবহারে ত্বকে অস্বস্তি

মশার কামড় বা পোকামাকড়ের কামড়ে অ্যালার্জি

আমেরিকান একাডেমি অফ পেডিয়াট্রিক্স (American Academy of Pediatrics)-এর মতে, গরম ও আর্দ্র পরিবেশে বা শিশুকে একাধিক স্তরে অতিরিক্ত পোশাক পরালে হিট র‍্যাশ সবচেয়ে বেশি দেখা দেয়।

ত্বকের সুরক্ষায় কিছু সহজ অথচ জরুরি টিপস
বিশেষজ্ঞরা বর্ষার দিনে শিশুর স্কিন কেয়ার রুটিনে হঠাত্ বড় কোনো পরিবর্তন না এনে ত্বকের স্বাভাবিক স্বাস্থ্য বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। ডা. পারিখের দেওয়া কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ নিচে দেওয়া হলো:

সঠিক স্নান: অতিরিক্ত গরম জলের বদলে হালকা উষ্ণ জলে শিশুকে স্নান করান।

মৃদু ক্লিনজার: নবজাতকের উপযোগী সুগন্ধহীন এবং হালকা ক্লিনজার ব্যবহার করুন। সাবানের পিএইচ (pH) মাত্রা ৫.৫ এর কাছাকাছি হওয়া উচিত, কারণ অতিরিক্ত ক্ষারযুক্ত সাবান ত্বকের প্রতিরক্ষামূলক স্তর নষ্ট করে দেয়।

ঘষে মোছা নিষেধ: তোয়ালে দিয়ে গায়ের জল জোরে ঘষে না মুছে বরং আলতোভাবে চেপে শুকিয়ে নিন।

ভাঁজগুলির যত্ন: স্নানের পর বা ঘামের পরে ঘাড়, কুঁচকি এবং বগলের মতো ত্বকের ভাঁজগুলি খুব ভালো করে এবং সম্পূর্ণভাবে শুকিয়ে নিন।

ঢিলেঢালা পোশাক: শিশুকে সবসময় নরম, ঢিলেঢালা সুতির পোশাক পরাবেন যাতে ত্বক সহজেই হাওয়া চলাচল করতে পারে।

ডায়াপার বদল: ভেজা জামাকাপড় এবং ডায়াপার সঙ্গে সঙ্গে বদলে ফেলুন।

পরিচ্ছন্নতা: শিশুর জামাকাপড়, তোয়ালে এবং বিছানার চাদর মৃদু ডিটারজেন্টে ধুয়ে রোদে বা ভালো করে শুকিয়ে তবেই ব্যবহার করুন।

বিশেষ পরামর্শ: “বাবা-মায়েরা প্রায়ই স্নান করানোর দিকে নজর দিলেও জল শুকানোর বিষয়টি এড়িয়ে যান। ঘাড়, কুঁচকি বা বগলের মতো ভাঁজে জমে থাকা আর্দ্রতা ফাঙ্গাল ইনফেকশনের মোক্ষম সুযোগ তৈরি করে। তাই বর্ষায় খুব আলতোভাবে অথচ নিখুঁতভাবে শরীর শুকনো রাখাটাই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা,” জানান ডা. পারিখ।

কখন চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে?
সঠিক পরিচর্যাতেও যদি শিশুর র‍্যাশ না কমে এবং নিচের লক্ষণগুলি দেখা দেয়, তবে অবিলম্বে পেডিয়াট্রিশিয়ামের পরামর্শ নেওয়া উচিত:

র‍্যাশ খুব দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে।

ত্বকে হলুদ রঙের আস্তরণ, পুঁজ বা দুর্গন্ধযুক্ত রস বের হলে।

ফোসকা বা ব্লিস্টার দেখা দিলে।

শিশুর জ্বর এলে।

শিশু দুধ খাওয়া বন্ধ করে দিলে বা অস্বাভাবিকভাবে ঝিমিয়ে পড়লে।

ত্বকের জ্বালায় শিশু অতিরিক্ত কান্নাকাটি করলে।

মনে রাখবেন, বর্ষার এই আর্দ্র ঋতুতে সামান্য সচেতনতা এবং সঠিক যত্নই আপনার আদরের নবজাতককে সমস্ত ধরণের ত্বকের সংক্রমণ থেকে সুরক্ষিত রাখতে পারে। যে কোনো জটিল সমস্যায় ঘরোয়া টোটকা না, সরাসরি চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই শ্রেয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *