পরপর ৩ বার আইভিএফ ফেল! এর কি আর সন্তান হওয়ার আশা নেই? কী বলছেন নামী ফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞরা?

টানা তিনবার আইভিএফ (IVF) সাইকেল ব্যর্থ হলে যেকোনো দম্পতি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, আর্থিকভাবে জর্জরিত হন এবং ভাবেন যে এবার হয়তো চেষ্টা বন্ধ করে দেওয়াই শ্রেয়। তবে পুণের নোভা আইভিএফ ফার্টিলিটির (Nova IVF Fertility) ফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞ ডা. রুপালি তাম্বে (Dr Rupali Tambe) জানাচ্ছেন যে, বারবার আইভিএফ ফেল করা নিঃসন্দেহে যন্ত্রণাদায়ক, তবে তিনটি ব্যর্থ প্রচেষ্টা মানেই যে প্যারেন্টহুডের রাস্তা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল, তা কিন্তু নয়। বরং এটি একটি সংকেত দেয় যে, কোনো ত্রুটি খুঁজে বের করতে এবং সঠিক পথ নির্ধারণ করতে একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ মেডিকেল রিঅ্যাসোসমেন্ট বা চিকিৎসাভিত্তিক মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে।
আইভিএফ কেন ব্যর্থ হতে পারে?
ডা. তাম্বির মতে, আইভিএফ ফেল করার পেছনে সাধারণত কোনো একটি একক কারণ থাকে না। এটি একাধিক চিকিৎসাগত, জিনগত এবং জীবনযাত্রার সমস্যার মিশ্রণ হতে পারে। ব্যর্থ হওয়া প্রতিটি সাইকেল চিকিৎসকদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্লিনিক্যাল তথ্য দেয়, যা পরবর্তী চেষ্টার আগে গলদগুলো শুধরে নিতে সাহায্য করে।
প্রধান কারণগুলির মধ্যে রয়েছে:
দুর্বল ভ্রূণের গুণগত মান (Poor Embryo Quality): মায়ের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিম্বাণুর মান কমে যাওয়া বা শুক্রাণুর ত্রুটির কারণে এমন হতে পারে। সফলভাবে ফার্টিলাইজেশন হলেও অনেক সময় ভ্রূণে ক্রোমোজোমের সমস্যা থাকে, যা ইমপ্লান্টেশনে বাধা দেয়।
ইমপ্লান্টেশন ফেলিওর (Implantation Failure): স্বাস্থ্য দেখতে ভালো হলেও সুস্থ ভ্রূণ অনেক সময় জরায়ুর দেয়ালে সঠিকভাবে সেঁটে যেতে পারে না। জরায়ুর ফাইব্রয়েড, এন্ডোমেট্রিয়াল পলিপ, অ্যাডেনোমায়োসিস বা পাতলা এন্ডোমেট্রিয়ামের মতো শারীরিক সমস্যা এর জন্য দায়ী।
হরমোন ও অন্যান্য সমস্যা: থাইরয়েড ডিসফাংশন, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম (PCOS), এন্ডোমেট্রিয়োসিস, অতিরিক্ত ওজন, ধূমপান বা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপও সফলতার হার কমিয়ে দেয়।
তিনটি আইভিএফ ফেল করার পর কী করা উচিত?
একই প্রোটোকল বারবার না চালিয়ে, চিকিৎসকরা সাধারণত আগের সাইকেলগুলির একটি বিস্তারিত পর্যালোচনা করার পরামর্শ দেন। এর মধ্যে থাকতে পারে:
ল্যাবরেটরি আউটকাম ও ভ্রূণের বিকাশ পর্যালোচনা।
ইমেজিং বা হিস্টিরোস্কপির মাধ্যমে জরায়ুর গহ্বর পরীক্ষা।
হরমোনাল মূল্যায়ন।
নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে ভ্রূণ বা মা-বাবার ক্রোমোজোমের জিনগত পরীক্ষা।
জীবনযাত্রার মান ও ওজনের মূল্যায়ন।
দম্পতিদের কি আইভিএফ চালিয়ে যাওয়া উচিত, নাকি থামানো উচিত?
ডা. তাম্বে জানান, এর কোনো সার্বজনীন উত্তর নেই। এটি নির্ভর করে মহিলার বয়স, ওভারিয়ান রিজার্ভ, ভ্রূণের মান, সামগ্রিক স্বাস্থ্য এবং দম্পতির মানসিক ও আর্থিক প্রস্তুতির ওপর। যদি জরায়ুর পলিপ অপসারণ বা হরমোনের ভারসাম্য ফেরানোর মতো কোনো নিরাময়যোগ্য কারণ খুঁজে পাওয়া যায়, তবে পরবর্তী সাইকেলে সাফল্যের জোরালো সম্ভাবনা থাকে।
উন্নত পরীক্ষা ও বিকল্প পথ
বারবার ইমপ্লান্টেশন ফেলিওরের ক্ষেত্রে কিছু রোগী উন্নত পরীক্ষা যেমন— Endometrial Receptivity (AIRA) বা ইমিউনোলজিক্যাল মার্কার পরীক্ষা থেকে উপকৃত হতে পারেন। তবে আন্তর্জাতিক নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রতিটি রোগীর ক্ষেত্রে অন্ধভাবে সব আধুনিক পরীক্ষা করানোর প্রয়োজন নেই।
যদি বারবার আইভিএফ ব্যর্থ হতেই থাকে, তবে দম্পতিরা অন্যান্য বিকল্প পথ বেছে নিতে পারেন:
ডোনার এগ (Donor egg) বা ডোনার স্পার্ম (Donor sperm) দিয়ে আইভিএফ।
এমব্রায়ো ডোনেশন (Embryo donation)।
জেস্টেশনাল সারোগেসি (Gestational surrogacy)।
দত্তক গ্রহণ (Adoption)।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তিনটি ব্যর্থ আইভিএফ সাইকেল অত্যন্ত কষ্টদায়ক হলেও এটি ফার্টিলিটি জার্নির শেষ নয়। সঠিক চিকিৎসা, প্রমাণভিত্তিক কাউন্সেলিং এবং উপযুক্ত কৌশল বদল করলে বাবা-মা হওয়ার স্বপ্ন আজও বাস্তব হতে পারে।