কথা বলতে ভুলে গেছেন স্ট্রোক রোগী? পরিচিত হিন্দি গান ফিরিয়ে আনবে হারানোর ভাষা, দেখাল নতুন গবেষণা!

স্ট্রোকের শিকার বহু মানুষ শুধু শারীরিক অক্ষমতাই নয়, বরং কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে এক কঠিন মানসিকভাবে বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। মস্তিষ্কের যে অংশ ভাষা নিয়ন্ত্রণ করে, স্ট্রোকের কারণে তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে রোগীরা কথা বলতে বা মনের ভাব প্রকাশ করতে অসমর্থ হন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘অ্যাফেসিয়া’ (Aphasia)। তবে সম্প্রতি এই রোগীদের কথা বলার ক্ষমতা দ্রুত ফিরিয়ে আনতে বিশেষজ্ঞদের হাতে এসেছে এক অভাবনীয় ও কার্যকরী মাধ্যম—মেলোডিক ইন্টনেশন থেরাপি বা হিন্দি গান ভিত্তিক মিউজিক থেরাপি।

সম্প্রতি আইআইটি দিল্লি (IIT Delhi), এইমস দিল্লি (AIIMS) এবং ইহাস (IHBAS)-এর গবেষকদের যৌথ প্রচেষ্টায় ভারতে এই থেরাপির সফল প্রয়োগ ও ইতিবাচক দিক সামনে এসেছে।

কীভাবে কাজ করে এই মিউজিক থেরাপি?
অনেক সময় দেখা যায়, একজন অ্যাফেসিয়া রোগী সাধারণ বাক্য বা শব্দ মুখে আনতে পারছেন না, কিন্তু সেই একই শব্দগুলো ছোটবেলা থেকে শুনে আসা কোনো সুর বা পরিচিত গানের তালে তালে খুব সহজেই বলে ফেলতে পারছেন!

নিউরোপ্লাস্টিসিটি (Neuroplasticity): মানুষের মস্তিষ্কের এক আশ্চর্য ক্ষমতা রয়েছে, যার মাধ্যমে এটি ক্ষতিগ্রস্ত অংশের কাজ বিকল্প কোনো অংশের মাধ্যমে নতুন সংযোগ তৈরি করে শিখতে পারে।

মস্তিষ্কের একাধিক অংশ সক্রিয় হওয়া: সাধারণ কথা বলার সময় মস্তিষ্কের সুনির্দিষ্ট কিছু অংশ কাজ করে। কিন্তু সুর ও ছন্দের সাহায্যে যখন কোনো পরিচিত হিন্দি গান গাওয়ানো হয়, তখন মস্তিষ্কের স্মৃতি, আবেগ ও ভাষার সঙ্গে যুক্ত বহু অংশ একসঙ্গে সচল হয়ে ওঠে।

ডান গোলার্ধের ব্যবহার: ব্রেনের বাঁ দিক (যা মূলত ভাষা নিয়ন্ত্রণ করে) ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ডান দিক (যা সুর ও সঙ্গীত নিয়ন্ত্রণ করে) সুরক্ষিত থাকে। গায়নের মাধ্যমে সেই ডান গোলার্ধকে কাজে লাগিয়ে কথা ফোটানো সম্ভব হয়।

কেন কার্যকর হিন্দি গানের ব্যবহার?
ভারতের বহু মানুষের কাছে শৈশব বা কৈশোর থেকে শুনে আসা হিন্দি গানগুলো কেবল সুর নয়, গভীর আবেগের সঙ্গে যুক্ত।

গবেষণার পর্যবেক্ষণ: গবেষকরা জানান, রোগীদের প্রিয় ও পরিচিত হিন্দি গান শোনানো এবং ছন্দের সাথে শব্দ উচ্চারণ করালে তা পুরনো অনুভূতিকে জাগিয়ে তোলে। ফলে রোগীর মধ্যে নিজে থেকে কথা বলার তাগিদ এবং আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বেড়ে যায়। গবেষণায় রোগীদের বাক্যের গঠন, বাচনভঙ্গি ও জীবনযাত্রার মানে দৃশ্যমান উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে।

সহায়ক থেরাপি হিসেবে চিকিৎসকদের পরামর্শ
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, মিউজিক থেরাপি কোনো ‘ম্যাজিক বুলেট’ বা মূল ওষুধের বিকল্প নয়। এটি একটি অত্যন্ত কার্যকর সহায়ক চিকিৎসা (Complementary Therapy)।

স্ট্রোক রোগীদের দ্রুত সুস্থতার জন্য নিউরোলজিস্টের পরামর্শমতো নিয়মিত ওষুধ, স্পিচ থেরাপি (Speech Therapy) ও শারীরিক ব্যায়াম চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি এই মিউজিক থেরাপিকে যুক্ত করলে কথা বলার ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক গুণ বেড়ে যায়। স্ট্রোক আক্রান্ত পরিবারগুলোর জন্য এই গবেষণা নিশ্চিতভাবেই এক নতুন আশা ও ভরসার বার্তা নিয়ে এলো।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *