“বিক্ষোভকারীরা পাকিস্তানের শত্রু, ভারতের সমান!” পিওকে হত্যাকাণ্ডকে প্রকাশ্যে সমর্থন পাক মন্ত্রীর!

বিতর্কিত মন্তব্যের জন্য পরিচিত পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজা আসিফ পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে (পিওকে) চলমান রক্তক্ষয়ী বিক্ষোভের মধ্যেই ফের এক উস্কানিমূলক মন্তব্য করেছেন। পিওকে-তে আন্দোলনরত সাধারণ মানুষের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর গুলি চালনা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে প্রকাশ্যে সমর্থন করে আসিফ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইসলামাবাদ-বিরোধী আন্দোলনে যারা রাস্তায় নেমেছেন, তিনি তাঁদের ভারতের মতোই শত্রু হিসেবে গণ্য করেন। একটি স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেলে সরকারের দমনপীড়নের পক্ষে সাফাই গাওয়ার সময় তিনি ভারত এবং পিওকে-তে প্রশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের মধ্যে কোনো তফাত করেননি। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আমি বিক্ষোভকারীদের ভারতের সমপর্যায়েই দেখি এবং ভারতের মতোই তাদের শত্রু বলে মনে করি।” এমনকি তিনি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সমস্ত ধরনের আলোচনার সম্ভাবনাও সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন।

পিওকে-তে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও ১৪ জনের মৃত্যু
‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সময় একাধিক বিতর্কিত মন্তব্য করে আলোচনায় আসা খোয়াজা আসিফের এই বক্তব্যটি এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন নিষিদ্ধ ঘোষিত ‘জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি’ (জেএএসি)-র নেতৃত্বে আয়োজিত এক বিশাল বিক্ষোভ মিছিলে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে। এই সংঘর্ষে অন্তত ১৪ জন নিহত হয়েছেন বলে খবর মিলেছে।

গত মঙ্গলবার, কাশ্মীরি শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি বিধানসভা আসন বাতিলের দাবিতে জেএএসি-র হাজার হাজার সমর্থক রাওয়ালকোট থেকে মুজাফফরাবাদের দিকে শান্তিপূর্ণ মিছিল করে এগিয়ে যান। জেএএসি-র অভিযোগ, এই ব্যবস্থার ফলে পিওকে-র প্রকৃত বাসিন্দাদের রাজনৈতিক অধিকার সম্পূর্ণভাবে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে এবং ইসলামাবাদ-ভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষে ওই অঞ্চলে অনৈতিকভাবে সরকার গঠনে প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব হচ্ছে। আন্দোলনকারী নেতাদের দাবি, শুধুমাত্র পিওকে-তে বসবাসকারী ব্যক্তিদেরই সেখানকার আইনসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ভোটদানের অধিকার থাকা উচিত।

সংগঠনটির সূত্র অনুযায়ী, প্রায় ৫,০০০ মানুষ অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে মিছিলে অংশ নিচ্ছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই পাকিস্তানি নিরাপত্তা কর্মীরা তাঁদের ওপর অতর্কিত গুলি চালায়। জেএএসি দাবি করেছে যে, এই গুলিবর্ষণে তাদের অন্তত ১৪ জন কর্মী নিহত এবং ২৪ জনেরও বেশি মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন। মর্মান্তিক এই ঘটনায় নিহতদের মধ্যে রয়েছেন জেএএসি-র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য উমর নাজিরের ছোট ভাই উসমান নাজিরও।

অন্যদিকে, পাকিস্তানি সরকারের তরফ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বিতর্কিত দাবি করা হয়েছে। প্রশাসনের অভিযোগ, বিক্ষোভকারীরা অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র বহন করছিল এবং নিরাপত্তা কর্মীদের লক্ষ্য করে প্রথমে হামলা চালিয়েছিল, যার ফলেই বাধ্য হয়ে এই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। এই ভয়াবহ ঘটনার জেরে পিওকে জুড়ে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে, যেখানে গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই লাগাতার আন্দোলন চলছে। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৫ জুন বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে এবং পরবর্তী সামরিক দমন-পীড়নের জেরে এখনও পর্যন্ত ৮০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।

নির্বাচনকে ‘লোক দেখানো প্রক্রিয়া’ আখ্যা দিল ভারত
পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণাধীন কাশ্মীরে (পিওকে) তথাকথিত আইনসভা নির্বাচন প্রক্রিয়াটিকে ওই অঞ্চলে পাকিস্তানের অবৈধ নিয়ন্ত্রণকে বৈধতা দেওয়ার একটি সুচতুর প্রচেষ্টা হিসেবে অভিহিত করে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তা প্রত্যাখ্যান করেছে নয়াদিল্লি। বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, এই ধরনের প্রহসনের নির্বাচন ওই ভূখণ্ড নিয়ে ভারতের সার্বভৌম অবস্থানকে একচুলও পরিবর্তন করতে পারবে না।

রণধীর জয়সওয়াল বলেন, “বর্তমানে যে লোক দেখানো নির্বাচনী প্রক্রিয়া চলছে, তা আসলে পাকিস্তানের অবৈধ দখলদারিত্বকে আড়াল করার এবং ওই অঞ্চলে তাদের চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বিশ্ববাসীর নজর থেকে গোপন করার একটি মরিয়া প্রচেষ্টা মাত্র।” জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল—যার মধ্যে পাকিস্তানের বেআইনি নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাগুলোও সম্পূর্ণভাবে অন্তর্ভুক্ত—তা যে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তা আরও একবার জোরালোভাবে পুনর্ব্যক্ত করেছে ভারত।

বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র পিওকে-তে চলমান গণবিক্ষোভকে বিচ্ছিন্ন কোনো আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা হিসেবে না দেখে বরং সেখানে জমে থাকা গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষের অনিবার্য ফল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “আমরা আগেই স্পষ্ট করে বলেছি, পাকিস্তান-অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীরে বর্তমানের এই গণবিক্ষোভ হল মূলত পাকিস্তানের বছরের পর বছর ধরে চলা অর্থনৈতিক শোষণ, সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার অস্বীকার এবং প্রশাসনিক নিপীড়নের প্রত্যক্ষ ফলাফল।”

উল্লেখ্য, পিওকে-তে এই তীব্র অসন্তোষ রাতারাতি তৈরি হয়নি। দীর্ঘ কয়েক মাস ধরেই ওই অঞ্চলের সাধারণ মানুষ আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামছাড়া দাম, ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং মুখ থুবড়ে পড়া শাসনব্যবস্থা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। অনেক বিক্ষোভকারী ন্যূনতম মূল্যে বিদ্যুৎ, ভর্তুকিযুক্ত আটা এবং প্রশাসনের কাছে অধিকতর জবাবদিহিতার দাবি জানিয়ে আসছেন। কালক্রমে এই স্থানীয় আন্দোলনই এখন ওই ভূখণ্ডে ইসলামাবাদের দীর্ঘদিনের দমনমূলক শাসনের বিরুদ্ধে জন-অসন্তোষের এক বৃহত্তর ও বিস্ফোরণমুখী রূপ ধারণ করেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *