অস্থায়ী হোমগার্ড নিয়োগে বেনিয়মের পাহাড়! লালবাজারের নির্দেশে শুরু স্বাধীন অডিট তদন্ত

রাজ্যে অস্থায়ী হোমগার্ড নিয়োগ ও তাঁদের মোতায়েন প্রক্রিয়া ঘিরে চলা ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে এবার তদন্ত শুরু করল রাজ্য প্রশাসন। বিশ্বস্ত সূত্রে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, লালবাজারের সরাসরি তত্ত্বাবধানে একজন স্বাধীন অডিটর (Independent Auditor) নিয়োগ করে এই ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত চালানো হচ্ছে। মূলত ২০২৪ সালের এপ্রিল মাস থেকে ২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত সময়কালের মধ্যে নিযুক্ত প্রায় ৮০০ জন অস্থায়ী হোমগার্ড নিয়োগ এবং তাঁদের কাজের ধরণই বর্তমানে এই পুরো তদন্তের মূল কেন্দ্রে রয়েছে।
কেন হয়েছিল এই নিয়োগ?
সরকারি সূত্রের দাবি অনুযায়ী, এই অস্থায়ী হোমগার্ডদের নিয়োগের মূল উদ্দেশ্য ছিল কোনা এক্সপ্রেসওয়ে এবং বিদ্যাসাগর সেতুতে চলা জরুরি নির্মাণ ও মেরামতির কাজের সময় শহরে যাতে তীব্র যানজট না হয়, তা নিয়ন্ত্রণ করা। সেই সময় কলকাতা পুলিশ, ব্যারাকপুর সিটি পুলিশ এবং হাওড়া সিটি পুলিশের সঙ্গে যৌথভাবে ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনায় তাঁদের ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল। তবে রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর এই প্রকল্প হঠাৎ করেই বন্ধ করে দেওয়া হয়, আর এর পরেই প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে একের পর এক চাঞ্চল্যকর প্রশাসনিক ও আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ।
ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের মারাত্মক অভিযোগ
স্বরাষ্ট্র দফতর ও বিভিন্ন পুলিশ কমিশনারেটের অভ্যন্তরীণ সূত্রে অভিযোগ উঠেছে যে, নিয়োগপ্রাপ্ত হোমগার্ডদের একটি বিরাট অংশকে তাঁদের নির্ধারিত ট্র্যাফিকের কাজে ব্যবহার না করে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে ব্যক্তিগত কাজে লাগিয়েছিলেন প্রভাবশালীরা।
তদন্তকারীদের সন্দেহ, কিছু পুলিশকর্মীর ব্যক্তিগত রাঁধুনি, গাড়িচালক এবং অন্যান্য পারিবারিক সহায়কদের এই সরকারি প্রকল্পের আওতায় হোমগার্ড হিসেবে খাতায়-কলমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। অথচ তাঁরা কোনো নির্ধারিত সরকারি দায়িত্ব পালন না করেই প্রতি মাসে নিয়মিত ১৮,৯০০ টাকা করে ভাতা তুলেছেন বলে অভিযোগ। এছাড়া কমিশনারেটগুলিতে জনবলের ঘাটতি মেটানোর অজুহাতে অনেক সিনিয়র আধিকারিক এই অস্থায়ী হোমগার্ডদের চুক্তির পরিপন্থী অন্যান্য প্রশাসনিক কাজেও ব্যবহার করেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সব নিয়োগ অনিয়মিত নয়
যদিও অভিযোগের পাহাড় জমেছে, তবুও পুলিশের একটি অংশের দাবি—পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াটিকে একসুরে ‘অনিয়মিত’ বা ভুয়া বলে দাগিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। কারণ, ওই প্রায় ৮০০ জনের বিশাল তালিকার একটি বড় অংশই ছিলেন প্রকৃত যোগ্য প্রার্থী। তাঁদের মধ্যে কলকাতা পুলিশের স্পোর্টস কোটায় নির্বাচিত নামী ক্রীড়াবিদরাও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, যাঁরা চুক্তির পুরো সময়জুড়ে অত্যন্ত সততা ও নিয়মানুবর্তিতার সঙ্গে নিজেদের নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
নথি তলব ও বর্তমান পরিস্থিতি
এই গোটা দুর্নীতির জাল কতদূর বিস্তৃত, তা খতিয়ে দেখতে তদন্তের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট কমিশনারেটগুলির কাছে কড়া নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছে। ডিউটি ডেপ্লয়মেন্ট রেজিস্টার (Duty Deployment Register), বেতন সংক্রান্ত যাবতীয় নথি এবং দৈনিক উপস্থিতির রেকর্ড (Attendance Record) তলব করা হয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ নথিগুলি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখেই নিয়োগ এবং দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে কোনো প্রশাসনিক বা আর্থিক তছরুপ হয়েছে কি না, তা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা হবে।
উল্লেখ্য, এই সমস্ত চাঞ্চল্যকর অভিযোগগুলি বর্তমানে সম্পূর্ণভাবে তদন্তাধীন রয়েছে। রাজ্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত চূড়ান্ত কোনো তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়নি এবং অভিযুক্ত কোনো পুলিশ আধিকারিকের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া সামনে আসেনি।