“চেয়ারকে অসম্মান করিনি, তবে…” বিধানসভায় দাঁড়িয়ে স্পিকারের সামনে কী সাফাই দিলেন কুণাল ঘোষ?

বুধবার বিধানসভার এক উত্তাল ঘটনার জেরে বেলেঘাটার তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধিকার ভঙ্গের নোটিস আনলেন রাজ্যের পরিষদীয় মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ। বিধানসভার অন্দরে দাঁড়িয়ে স্বয়ং মন্ত্রী সেই নোটিস সকলের সামনে পড়ে শোনান এবং দলীয় শৃঙ্খলা ও শিষ্টাচারের কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘‘আপনারা সতীর্থ… আপনাদের নিজেদের সমস্যা নিজেদেরই আলোচনার মাধ্যমে মিটিয়ে নিতে হবে।’’ এর পরেই বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বোসের উদ্দেশে নিজের বক্তব্য পেশ করেন কুণাল ঘোষ।
স্পিকারের সামনে কুণাল ঘোষের সাফাই:
বিধানসভায় দাঁড়িয়ে কুণাল ঘোষ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘‘আমি প্রথমেই পরিষ্কার করে বলতে চাই যে, আমি আপনার চেয়ারকে বিন্দুমাত্র অসম্মান করিনি। তবে আপনার যদি মনে হয় যে আমার আচরণে চেয়ার অসম্মানিত হয়েছে, তাহলে আমি এর জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখিত।’’
নিজের ক্ষোভ উগরে দিয়ে তৃণমূল বিধায়ক আরও বলেন, ‘‘তুমিও এখানে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে প্রতিনিধি হিসেবে এসেছ, আমিও নির্বাচিত হয়েই এখানে এসেছি। আমরা আমাদের দাবিদাওয়া নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে গিয়েছিলাম। আমরা বসার জন্য আলাদা ঘর চেয়েছিলাম, তখন মুখ্যমন্ত্রী পরিষদীয় মন্ত্রীকে বিষয়টি দেখতে বলেন। আমরা বিধানসভায় কথা বলার জন্য নির্দিষ্ট সময় চাই। মুখ্যমন্ত্রী পরিষদীয় মন্ত্রীকে সেটিও দেখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আমাদের বিরোধী দলের চিফ হুইপ আখরুজ্জামানকে শোভনদেব চ্যাটার্জি আমাদের নাম পাঠান। ওনার সাথে আমার ব্যক্তিগত কোনো শত্রুতা বা সমস্যা নেই। আমি যা করেছি, তা আমার দলের নীতির পক্ষে একটি প্রতীকী প্রতিবাদ মাত্র, কাউকে অসম্মান করার জন্য নয়। কিন্তু এখন আমার ওপর ভুল ব্যাখ্যা চাপিয়ে দিলে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’’
পরিষদীয় মন্ত্রী ও স্পিকারের প্রতিক্রিয়া:
উত্তপ্ত পরিস্থিতির জবাবে পরিষদীয় মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ জানান, ‘‘আপনারা প্রত্যেকেই দলের সতীর্থ। আপনাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা আপনাদেরই বসে দূর করতে হবে। বিরোধী চিফ হুইপ সদনে যে অফিসিয়াল তালিকা জমা দেন, নিয়ম অনুযায়ী সেটাই মান্যতা পায়। আপনারা আপনাদের বক্তব্য নিয়মতান্ত্রিকভাবে বলুন।’’ অন্যদিকে, সমস্ত পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে বিধানসভার অধ্যক্ষ রথীন্দ্র বসু জানান যে, বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে পর্যালোচনা চলছে এবং আপাতত পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
ঠিক কী কারণে দানা বেঁধেছিল এই বিবাদ?
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে শাসক দলের অন্দরে কালীঘাটপন্থী বিধায়কদের কোণঠাসা করার অভিযোগ উঠছে। কুণাল ঘোষের মূল অভিযোগ ছিল, কালীঘাটপন্থী বিধায়কেরা বিধানসভার অধিবেশনে নিয়মমাফিক কথা বলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিপরীতে ঋতব্রতপন্থীদের বিধানসভায় প্রধান বিরোধী পক্ষ হিসেবে মান্যতা দেওয়া হয়েছে, যেখানে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী দলনেতা এবং আখরুজ্জামান চিফ হুইপের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। কুণাল ঘোষের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল, বক্তার তালিকায় নাম জমা দেওয়া সত্ত্বেও চিফ হুইপ বারবার তাঁদের নাম বক্তার তালিকা থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দিয়ে দিচ্ছেন।
আর এই ক্ষোভের বশেই গত বুধবার বিধানসভার অন্দরে রীতিমতো তুলকালাম কাণ্ড ঘটে। ওই দিন বিধানসভায় স্বরাষ্ট্র দপ্তরের বাজেট নিয়ে আলোচনা চলাকালীন যখন চিফ হুইপ আখরুজ্জামান বক্তব্য রাখতে ওঠেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই কুণাল ঘোষ তাঁর আসনের সামনে গিয়ে তীব্র আপত্তি জানান। বেলেঘাটার বিধায়ককে সরাসরি বলতে শোনা যায়, ‘‘আপনি আমার নাম তালিকা থেকে কেটে দিচ্ছেন কেন?’’ সেই সময় আখরুজ্জামানের পাশেই বসেছিলেন হেভিওয়েট মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম, জাভেদ খান এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়।
কুণাল ঘোষ নিজের অবস্থান থেকে সরে না আসায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে শাসক-বিরোধী উভয় পক্ষই ময়দানে নামে। এমনকি বিজেপি পরিষদীয় মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ ও উচ্চ শিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ও ওয়েলে নেমে আসেন। স্পিকার রথীন্দ্র বসু বারবার কুণাল ঘোষকে নিজের আসনে গিয়ে বসার অনুরোধ জানালেও তিনি তা শোনেননি। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে মার্শাল ডেকে কুণাল ঘোষকে বিধানসভার বাইরে বের করে দেওয়া হয়, যা নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে বর্তমানে তীব্র চর্চা শুরু হয়েছে।