রক্তাক্ত দালাল স্ট্রিট! সেনসেক্স বসল ৮৬০ পয়েন্ট, শেয়ার বাজারে হু হু করে পতন কেন?

চলতি সপ্তাহের পাঁচ দিনের ট্রেডিং সেশনেই পতনের খাদে তলিয়ে গেল দেশের শেয়ার বাজার। শুক্রবার বাজার খোলামাত্রই দেশের দুই প্রধান স্টক এক্সচেঞ্জে বড় ধরনের ধস নামে। সেনসেক্স এবং নিফটি—উভয় বেঞ্চমার্ক ইনডেক্সই ১ শতাংশের বেশি পতনের মুখ দেখেছে। পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, আমেরিকার নতুন ট্যারিফ নীতি এবং মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার রেকর্ড পতন—এই সমস্ত কারণের জেরে স্টক মার্কেটে কন্টিনিউয়াস ‘ডাউন ট্রেন্ড’ বজায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

বাজারের বর্তমান চিত্র

শুক্রবার বেলা ১১টার তথ্য অনুযায়ী:

  • সেনসেক্স: ৮৬১ পয়েন্ট বা ১.১২ শতাংশের বেশি কমে অবস্থান করছিল। বিএসই সেনসেক্সের ইন্ট্রাডে লো (Intraday Low) নেমে গিয়েছিল ৭৫,৫১৪ পয়েন্টে

  • নিফটি৫০: ২৩৮ পয়েন্ট বা ১ শতাংশের বেশি কমে ইন্ট্রাডে লো ছুঁয়েছে ২৩,৬১৩ পয়েন্টে

  • বাজারের ক্ষতি: এই রক্তক্ষয়ী পতনের জেরে বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জে (BSE) তালিকাভুক্ত সমস্ত সংস্থার মোট মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশন বা বাজার মূলধন এক ধাক্কায় প্রায় ৬ লক্ষ কোটি টাকা কমে গেছে।

পাশাপাশি, মিডক্যাপ ও স্মলক্যাপ ইনডেক্সগুলিও ১ শতাংশের বেশি কমেছে। নিফটির সমস্ত সেক্টরাল ইনডেক্স ধসে পড়েছে, কেবল এফএমসিজি (FMCG) খাতে পতনের মাত্রা কিছুটা কম দেখা গেছে।

শেয়ার বাজার পতনের ৬ প্রধান কারণ

১. ১০০ ডলার ছাড়াল অশোধিত তেলের দাম: আন্তর্জাতিক বাজারে টানা ষষ্ঠ দিনের মতো উর্ধ্বমুখী ব্রেন্ট ক্রুডের দাম। শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুডের সেপ্টেম্বর চুক্তির দাম প্রতি ব্যারেলে ১০১ ডলার ছুঁয়েছে। চলতি সপ্তাহেই ব্রেন্টের দাম প্রায় ১৫ শতাংশ এবং জুলাই মাসেই প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতের মতো তেল আমদানিনির্ভর দেশের ক্ষেত্রে এটি মূল্যস্ফীতি ও আমদানি বিলের ওপর গভীর চাপ সৃষ্টি করছে।

২. আমেরিকা-ইরান সংঘাতের আশঙ্কা: পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে আরও বড় সামরিক অভিযাল চালানোর কথা বিবেচনা করছেন বলে খবর মিলেছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ব বাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

৩. মার্কিন বন্ডের ইয়েল্ড বৃদ্ধি: আমেরিকার ১০ বছরের সরকারি বন্ডের ইয়েল্ড বেড়ে ৪.৭১১ শতাংশে পৌঁছেছে। বন্ডের ইয়েল্ড বৃদ্ধি পেলে বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা (FII) ঝুঁকিপূর্ণ ইক্যুইটি বাজার থেকে টাকা তুলে নিরাপদ বন্ডে বিনিয়োগ করতে শুরু করেন। এর ফলে ভারতের মতো উদীয়মান বাজারগুলি থেকে বিদেশি পুঁজি বেরিয়ে যাওয়ার ভয় তৈরি হয়।

৪. ট্রাম্পের নতুন ট্যারিফ বা শুল্ক নীতি: আমেরিকা সম্প্রতি একাধিক দেশের উপর নতুন শুল্ক চাপিয়েছে। ব্রাজিলের উপর ২৫%, কানাডার উপর ৫০% এবং জেনেরিক ওষুধে ২০০% শুল্কের ঘোষণার পাশাপাশি ৬০টি বাণিজ্য অংশীদার দেশের উপর ১০% থেকে ১২.৫% পর্যন্ত নতুন ট্যারিফ ঘোষণা করা হয়েছে। ভারতের উপর ১০% শুল্ক ধার্য করা হয়েছে, যা রপ্তানিনির্ভর ভারতীয় সংস্থাগুলির ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা বাড়িয়েছে।

৫. টাকার দর পতন: শুক্রবার মার্কিন ডলারের বিপরীতে ভারতীয় টাকা ৯৬.৬৩ স্তরে লেনদেন শুরু করে। টাকার দর সর্বকালের সর্বনিম্ন স্তরের দিকে এগোতে থাকায় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়াকে (RBI) বাজারে হস্তক্ষেপ করতে দেখা গেছে। দুর্বল মুদ্রা আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে বাজারকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।

৬. বিশ্ব বাজারের নেতিবাচক প্রভাব: শুধু ভারত নয়, এশিয়ার অন্যান্য প্রধান শেয়ার বাজারগুলিতেও এদিন ব্যাপক পতন দেখা গিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি সূচক প্রায় ৬%, জাপানের নিক্কেই প্রায় ৩% এবং তাইওয়ান ওয়েটেড সূচক ২ শতাংশের বেশি কমেছে। চিনের সাংহাই ও হংকংয়ের হ্যাং সেং সূচকও ১ শতাংশের বেশি নিচে নেমেছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে দালাল স্ট্রিটে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *