মার্কিন মুলুকে ওষুধ রপ্তানিতে বিরাট ধাক্কা! ট্রাম্পের নতুন চালে ঘুম উড়ল ভারতীয় ফার্মা শিল্পের

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক যুগান্তকারী ঘোষণায় বিশ্বজুড়ে ওষুধ বাজারে চরম শোরগোল শুরু হয়েছে। ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, আগামী দুই বছর আমদানি করা জেনেরিক ওষুধের উপর কোনো শুল্ক (০%) বসানো হবে না। তবে তিনি স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছেন, এই দুই বছরের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর বিদেশে উৎপাদিত জেনেরিক ওষুধের উপর প্রথমে ১০০ শতাংশ এবং পরবর্তীতে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত বিপুল আমদানি শুল্ক চাপানো হতে পারে, যদি ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলি তাদের উৎপাদন কেন্দ্র আমেরিকায় স্থানান্তরিত না করে।

ট্রাম্পের এই কঠোর নীতি মূলত তাঁর ‘আমেরিকায় উৎপাদন’ (Made in America) এজেন্ডারই একটি অংশ। এর মূল লক্ষ্য, বিদেশের উপর ওষুধনির্ভরতা সম্পূর্ণ কমিয়ে আমেরিকার মাটিতেই উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। আর এই নীতির জেরে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ধাক্কার মুখে পড়তে চলেছে ভারত, কারণ বিশ্বজুড়ে ভারতকে ‘ফার্মেসি অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’ বলা হয় এবং ভারতীয় ওষুধ শিল্পের অন্যতম প্রধান ও বৃহত্তম রপ্তানি বাজার হলো এই আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র।

কেন ভারতের জন্য এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত উদ্বেগের?
অ্যান্টিবায়োটিক, ডায়াবেটিসের ওষুধ থেকে শুরু করে জীবনরক্ষাকারী ক্যানসারের ওষুধ—বিপুল পরিমাণ জেনেরিক ওষুধ নিয়মিত আমেরিকায় রপ্তানি করে ভারত। যদি ভবিষ্যতে এই ১০০ থেকে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত চড়া শুল্ক কার্যকর হয়, তবে ভারত থেকে রপ্তানি হওয়া সেই সমস্ত ওষুধের দাম হু হু করে বেড়ে যাবে। ফলে মার্কিন বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে চরম সংকটের মুখে পড়বে ভারতীয় ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলি।

হঠাৎ কেন এই দুই বছরের ছাড়?
হঠাৎ করে কোনো রকম আগাম প্রস্তুতি ছাড়া উচ্চ শুল্ক বসালে মার্কিন মুলুকে জীবনরক্ষাকারী ওষুধের চরম সরবরাহ সংকট তৈরি হতে পারত এবং সাধারণ মানুষের চিকিৎসার খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেত। এই সম্ভাব্য বিপর্যয় এড়াতেই ট্রাম্প প্রশাসন ওষুধ কোম্পানিগুলিকে দুই বছরের সময়সীমা দিয়েছে। এই সময়ের মধ্যে সংস্থাগুলি চাইলে ধীরে ধীরে আমেরিকায় উৎপাদন স্থানান্তর করতে পারবে এবং আমেরিকাও নিজেদের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর পর্যাপ্ত সুযোগ পাবে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলেকট্রনিক্স বা পোশাক শিল্প খাতের মতো রাতারাতি ওষুধ উৎপাদন অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়া কোনোভাবেই সহজ কাজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন নতুন কারখানা স্থাপন, কঠোর নিয়ন্ত্রক অনুমোদন, ইউএস এফডিএ (US FDA)-র বিশেষ ছাড়পত্র এবং সম্পূর্ণ নতুন একটি সরবরাহ ব্যবস্থা বা সাপ্লাই চেইন গড়ে তোলা।

কার উপর প্রভাব পড়বে সবচেয়ে বেশি?
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নীতির ফলে সমস্ত সংস্থার উপর একই রকম প্রভাব পড়বে না। যেসব ভারতীয় সংস্থার ইতিমধ্যেই মার্কিন মুলুকে নিজেদের উৎপাদন কেন্দ্র রয়েছে বা একাধিক দেশে উৎপাদনের বিকল্প ব্যবস্থা চালু আছে, তারা তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। কিন্তু যেসব সংস্থা সম্পূর্ণভাবে ভারত থেকে আমেরিকার বাজারে রপ্তানির উপর নির্ভরশীল, তাদের ক্ষেত্রে আর্থিক চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যাবে।

আমেরিকায় কি ওষুধের দাম বাড়বে?
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই নীতির জেরে আমেরিকায় ওষুধের দাম মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। বর্তমানে মার্কিন মুলুকে ব্যবহৃত অধিকাংশ প্রেসক্রিপশনের ওষুধই জেনেরিক, কারণ এগুলির দাম ব্র্যান্ডেড ওষুধের তুলনায় অনেক কম হয়। অতিরিক্ত শুল্কের বোঝা চাপলে সংস্থাগুলি সেই খরচ পরিবেশক, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যবিমা সংস্থার উপর চাপাবে, যার জেরে শেষ পর্যন্ত সাধারণ রোগীদের পকেট থেকেই বেশি টাকা খরচ হবে। রয়টার্সের উদ্ধৃত বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক কোম্পানি যদি অতিরিক্ত শুল্কের ভয়ে আমেরিকায় রপ্তানি কমিয়ে দেয়, তবে আগামী দিনে সেখানে ওষুধের তীব্র ঘাটতির সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

এখন দেখার বিষয়, ছোট ও মাঝারি আকারের ভারতীয় সংস্থাগুলি এই ব্যয়বহুল পরিবর্তন বা আমেরিকায় নতুন করে উৎপাদন কারখানা গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ কীভাবে মোকাবিলা করে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *