বিশ্বজুড়ে জ্বালানি হাহাকার, অথচ ভারত সুরক্ষিত! কীভাবে সামলাল নজিরবিহীন এই সঙ্কট?

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলার ঘটনা এবং পরবর্তীতে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ ‘হরমুজ প্রণালী’ বন্ধ হয়ে যাওয়া ভারতের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার সামনে এক বিরাট পরীক্ষার মুহূর্ত ছিল। ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির ৯০ শতাংশ এবং এলপিজি আমদানির ৬০ শতাংশই আসে এই পথ দিয়ে। এই সঙ্কট মোকাবিলায় ভারত যে বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে, তা বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে।

ভারত কীভাবে সামলাল এই নজিরবিহীন সঙ্কট?

  • উৎস বহুমুখীকরণ (Diversification): হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে ভারত দ্রুত অন্য দেশ থেকে তেল আমদানি শুরু করে। আমেরিকা, নরওয়ে, কানাডা, আলজেরিয়া এবং রাশিয়ার মতো দেশ থেকে জ্বালানি সংগ্রহের ওপর জোর দেওয়া হয়। ফলে, প্রণালী বন্ধ থাকা সত্ত্বেও ভারত বিকল্প উৎস থেকে চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ তেল সংগ্রহ নিশ্চিত করতে পেরেছিল।

  • কৌশলী মজুত ভাণ্ডার (Strategic Reserves): ভারত সরকারের তৈরি কৌশলগত খনিজ তেল ভাণ্ডার (SPR) এই সংকটকালীন সময়ে বড় সুরক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করেছে। বিশাখাপত্তনম, ম্যাঙ্গালুরু ও পাডুরের মাটির নিচের গুদামগুলিতে থাকা মজুত তেল দেশের অভ্যন্তরীণ ঘাটতি সামাল দিতে সাহায্য করেছে।

  • উৎপাদন ও বরাদ্দ নীতি: রান্নার গ্যাসের (LPG) সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার কঠোর নীতি নিয়েছিল। ৮ মার্চ একটি ‘LPG কন্ট্রোল অর্ডার’ জারি করে রিফাইনারিগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয় যে, তারা যেন প্রোোপেন, বিউটেন ও প্রোপিলিনকে শুধুমাত্র এলপিজি উৎপাদনের কাজেই ব্যবহার করে।

  • কূটনৈতিক তৎপরতা: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং ইউএই (UAE)-সহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে বিশেষ সমঝোতা ভারতের জ্বালানি সরবরাহকে ত্বরান্বিত করেছে। এমনকি মার্কিন প্রশাসনের সহায়তায় স্বল্পমেয়াদী স্যাংশন ছাড় (waiver) পাওয়ার ফলে ভারত রুশ তেলও নিরবচ্ছিন্নভাবে আমদানি করতে পেরেছে।

  • চাহিদা নিয়ন্ত্রণ: অহেতুক জ্বালানি খরচ কমাতে সরকার সচেতনতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং শিল্প সংস্থাগুলোকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের অনুমতি দেয়, যা রান্নার গ্যাসের ওপর চাপ অনেকটা কমিয়েছিল।

ফলাফল: জুন মাসের মাঝামাঝি আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সমঝোতার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে। তবে ভারত এই সংকট থেকে বড় শিক্ষা নিয়েছে। যুদ্ধজনিত দাম বাড়ার প্রভাব ভারতের খুচরো বাজারে যাতে খুব বেশি না পড়ে, তার জন্য সরকার যে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছিল, তার জেরেই আজ ভারত বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব রেকর্ড করতে পেরেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *