“৩০০ কোটি বছর আগের…’”-বিশ্বের সবচেয়ে পুরানো উল্কা গহ্বরের সন্ধান পেলেন বিজ্ঞানীরা

আদি পৃথিবীর গঠনপ্রক্রিয়া ও প্রাণের বিকাশের ইতিহাসের একটি নতুন অধ্যায় উন্মোচিত হলো। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার দুর্গম পিলবারা অঞ্চলে বিজ্ঞানীরা খুঁজে পেয়েছেন প্রায় ৩০০ কোটি বছর আগের একটি বিশাল উল্কা গহ্বর। এটি এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত পৃথিবীর প্রাচীনতম উল্কাপাতের স্থান হিসেবে স্বীকৃত। ‘জিওলজি’ বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণার ফলে পৃথিবীর আদিম ও হিংস্র রূপ সম্পর্কে নতুন ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।

প্রাচীনতমের নতুন রেকর্ড: এর আগে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার ‘ইয়ারাবুব্বা’ গহ্বরটি বিশ্বের প্রাচীনতম উল্কাপাতের স্থান হিসেবে পরিচিত ছিল, যার বয়স প্রায় ২২০ কোটি বছর। কিন্তু নতুন এই ‘নর্থ পোল ডোম ক্রেটার’ সেই রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। গবেষণায় নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, এই গহ্বরটি ৩০০ কোটি বছর আগের, যখন পৃথিবীতে টেকটোনিক প্লেটের গঠন শুরু হয়েছিল এবং আদিম প্রাণের (সায়ানোব্যাকটেরিয়া) বিকাশ ঘটছিল।

কীভাবে নিশ্চিত হলেন বিজ্ঞানীরা? কার্টিন ইউনিভার্সিটির গবেষকরা দুটি উদ্ভাবনী পদ্ধতি ব্যবহার করে এই উল্কাপাতের সময়কাল নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করেছেন:

  • জিরকন খনিজের বিশ্লেষণ: উল্কাপাতের তীব্র তাপে পাথরের ভেতরে থাকা জিরকন স্ফটিকগুলোর আকার পরিবর্তিত হয়ে কাঁটার মতো অদ্ভুত কঙ্কাল সদৃশ কাঠামো ধারণ করেছিল, যা সচরাচর চাঁদের গহ্বরগুলোতে দেখা যায়।

  • অ্যাপাটাইট বিশ্লেষণ: উল্কাপাতের পর তীব্র তাপ ও উত্তপ্ত তরলের কারণে পাথরের ফাটলে ক্যালসিয়াম ফসফেট বা ‘অ্যাপাটাইট’ খনিজ তৈরি হয়েছিল। গবেষকরা এই দুটি খনিজের বয়স বিশ্লেষণ করে এই অকাট্য প্রমাণের সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।

কেমন ছিল সেই আদি পৃথিবী? গবেষক অধ্যাপক ক্রিস কার্কল্যান্ড জানিয়েছেন, যখন এই উল্কাটি আঘাত হেনেছিল, তখন পৃথিবী আজকের মতো ছিল না। সেই সময় পৃথিবী ছিল মূলত পানিময়, স্থলের পরিমাণ ছিল নগণ্য। সূর্য বর্তমানের তুলনায় অনেকটাই স্তিমিত ছিল এবং চাঁদ ছিল পৃথিবীর অনেক কাছাকাছি।

কেন এই আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ? ম্যাককুয়ারি ইউনিভার্সিটির ভূ-রসায়নবিদ ব্রুস শেফার এই গবেষণাকে এক ‘গোয়েন্দা কাহিনী’র সাথে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, পৃথিবীর টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়া ও ক্ষয়ের কারণে কোটি কোটি বছরের পুরোনো উল্কাপাতের চিহ্নগুলো বেশিরভাগই মুছে গেছে। সেই হিসেবে পিলবারা অঞ্চলের এই শিলাস্তরগুলো ‘টাইম ক্যাপসুল’ হিসেবে কাজ করছে। এই আবিষ্কার আদি পৃথিবীর উপর ক্রমাগত উল্কাপিণ্ডের সেই প্রলয়ঙ্করী আঘাতগুলোর প্রত্যক্ষ প্রমাণ দেয়, যা আগে কেবল চাঁদের পৃষ্ঠেই দেখা যেত।

বিজ্ঞানীদের মতে, এই ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়াই শেষ পর্যন্ত পৃথিবীকে আজকের বাসযোগ্য গ্রহ হিসেবে গড়ে তোলার পথ প্রশস্ত করেছিল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *