বাজার নয়, মানুষই আসল: জিডিপি-মুক্ত নতুন পৃথিবী গড়ার লক্ষ্যে বড় উদ্যোগ

এতদিন যেকোনো দেশের উন্নয়নের প্রধান সূচক ছিল ‘জিডিপি’ (GDP)। কিন্তু কেবল বাজারের উৎপাদন দিয়ে কি একটি সমাজের প্রকৃত ভালো থাকা বা সমৃদ্ধি পরিমাপ করা সম্ভব? এই প্রশ্নকেই এবার জোরালোভাবে সামনে আনল রাষ্ট্রসঙ্ঘ। একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ কমিটির তৈরি ‘বিয়ন্ড জিডিপি’ (Beyond GDP) রিপোর্ট বিশ্ব অর্থনীতি ও সমাজভাবনায় নতুন আলোচনার সূত্রপাত করেছে।
কেন জিডিপি যথেষ্ট নয়? অর্থনীতিবিদদের মতে, জিডিপি মূলত একটি নির্দিষ্ট সময়ে কোনো দেশের ভেতরে উৎপাদিত পণ্য ও পরিষেবার আর্থিক মূল্য প্রকাশ করে। কিন্তু এটি পরিবেশের ভারসাম্য, মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য, আয় বৈষম্য বা সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলিকে উপেক্ষা করে। তাই রাষ্ট্রসঙ্ঘের মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুতরেসের উদ্যোগে তৈরি এই রিপোর্টে চিরাচরিত রীতনীতির উর্ধ্বে উঠে উন্নয়নের এক নতুন রূপরেখা তৈরির কথা বলা হয়েছে।
কী আছে ‘বিয়ন্ড জিডিপি’ রিপোর্টে? কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কৌশিক বসু এবং তুলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নোরা লাস্টিংয়ের নেতৃত্বে গঠিত এই উচ্চপর্যায়ের কমিটি ৩১টি ভিন্নধর্মী বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। এই প্রতিবেদনের মূল লক্ষ্যগুলি হলো:
-
সামগ্রিক ভালো থাকা: কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, বরং নাগরিকের জীবনযাত্রার মান এবং সন্তুষ্টিকে উন্নয়নের মাপকাঠি হিসেবে ধরা।
-
পরিবেশের ভারসাম্য: টেকসই উন্নয়নের ওপর জোর দিয়ে প্রকৃতিকে রক্ষা করা।
-
আর্থিক স্থিতিশীলতা: এমন একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিকাঠামো তৈরি করা যা দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল এবং মানবিক।
একটি নতুন যুগের শুরু: ২০২৪ সালের একটি আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রেক্ষিতে শুরু হওয়া এই গবেষণাটি মে মাসের ৭ তারিখ প্রকাশিত হয়েছে। গত কয়েক দশকে উন্নয়ন নিয়ে যে সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, এই রিপোর্টে তার একটি সুসংহত বিশ্লেষণ রয়েছে। কমিটির যুগ্ম প্রধান কৌশিক বসু জানিয়েছেন, উন্নয়ন কেবল সংখ্যার কারসাজি নয়, বরং মানুষ কতখানি সুরক্ষিত ও উন্নত জীবনযাপন করছে, সেটাই আসল।
বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব: এই রিপোর্টটি কার্যকর হলে আগামী দিনে বিশ্বজুড়ে উন্নয়নের সংজ্ঞা বদলে যেতে পারে। দেশগুলি কেবল জিডিপির লক্ষ্যমাত্রার পেছনে না ছুটে, মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্বচ্ছ পরিবেশ এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ওপর বেশি মনোযোগ দিতে বাধ্য হবে।
পৃথিবীকে কি সত্যিই জিডিপি-র শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে এক মানবিক ও স্থিতিশীল গন্তব্যে নিয়ে যাওয়া সম্ভব? এই রিপোর্টটি সেই দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যের দিকে প্রথম বড় পদক্ষেপ।