ভারতে প্রতি বছর ১০,০০০ শিশুর শরীরে এই মারণ রোগ! আপনার অজান্তেই কি আপনার শরীরেও লুকিয়ে রয়েছে ঘাতক জিন?

থ্যালাসেমিয়া—একটি নিঃশব্দ বংশগত রক্তের রোগ, যা মানুষের সাধারণ ধারণার চেয়েও অনেক বেশি মাত্রায় থাবা বসিয়েছে সমাজে। পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ১.৫% মানুষ অজান্তেই বিটা-থ্যালাসেমিয়া জিন বহন করে চলেছেন। আর ভারতের ছবিটা আরও উদ্বেগজনক; এখানে প্রতি বছর ১০,০০০-এরও বেশি শিশু ‘থ্যালাসেমিয়া মেজর’ নামক মারাত্মক অবস্থা নিয়ে জন্মায়। জিনের মাধ্যমে বাবা-মা থেকে সন্তানের শরীরে সংক্রমিত হওয়া এই রোগের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, বাহকদের শরীরে প্রায়শই কোনো বাহ্যিক লক্ষণ প্রকাশ পায় না। ফলে পরীক্ষা না করা পর্যন্ত তারা নিজেরাও জানেন না যে তারা এই মারণ জিন বহন করছেন। সচেতনতার অভাব এবং সময়মতো স্ক্রিনিং না হওয়াই আজ থ্যালাসেমিয়াকে একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত করেছে।

প্রাথমিক লক্ষণ: সাধারণ ক্লান্তি ভেবে ভুল করবেন না
ক্রায়োভাইভা লাইফ সায়েন্সেস-এর চিকিৎসা মুখপাত্র ডাঃ গীতিকা জাসাল জানিয়েছেন, থ্যালাসেমিয়ার সবচেয়ে বড় জটিলতা হলো এর প্রাথমিক উপসর্গগুলোকে সাধারণ দুর্বলতা বা অ্যানিমিয়া (রক্তাল্পতা) ভেবে ভুল করা হয়। আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি, ফ্যাকাশে ত্বক, চরম দুর্বলতা এবং বয়স অনুযায়ী ওজন ও উচ্চতা না বাড়ার মতো লক্ষণ দেখা যায়। প্রায়শই রোগটি যখন গুরুতর রূপ নেয়, তখনই কেবল এটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

চিকিৎসা না হলে কতটা বিপজ্জনক?
ডাঃ গীতিকা আরও ব্যাখ্যা করেছেন যে, সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং উপযুক্ত চিকিৎসা না হলে থ্যালাসেমিয়া মেজর রোগীর হৃৎপিণ্ড, যকৃৎ (লিভার) এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কার্যক্ষমতা সম্পূর্ণ নষ্ট করে দিতে পারে। এমনকি এর প্রভাবে হাড়ের গঠন ও আকার পর্যন্ত বিকৃত হয়ে যায়। আক্রান্ত রোগীকে বাঁচিয়ে রাখতে ঘন ঘন রক্ত সঞ্চালনের (Blood Transfusion) প্রয়োজন হয়, যা রোগীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করার পাশাপাশি তার আয়ুষ্কালও অনেকাংশে কমিয়ে দেয়।

বিয়ের আগে স্ক্রিনিং কেন বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত?
বিশেষজ্ঞদের মতে, থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধের একমাত্র চাবিকাঠি হলো সচেতনতা এবং সময়োপযোগী পরীক্ষা। একটি অতি সাধারণ রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমেই জানা সম্ভব কোনো ব্যক্তি এই জিনের বাহক কি না। বিশেষ করে যারা নতুন পরিবার শুরু করার পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য এই পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি।

ভয়াবহ ২৫% ঝুঁকি: যদি বাবা-মা উভয়েই থ্যালাসেমিয়ার বাহক হন, তবে প্রতি গর্ভাবস্থায় সন্তানের ‘থ্যালাসেমিয়া মেজর’ নিয়ে জন্মানোর ঝুঁকি ২৫% পর্যন্ত বেড়ে যায়। এই পরিস্থিতি এড়াতে বিবাহপূর্ব ও গর্ভধারণ-পূর্ববর্তী স্ক্রিনিং এবং জেনেটিক কাউন্সেলিং দম্পতিদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। যেসব দেশ নিয়মিত স্ক্রিনিং কর্মসূচি বাধ্যতামূলক করেছে, তারা থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুর জন্মহার প্রায় শূন্যে নামিয়ে এনেছে।

নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসার নতুন দিগন্ত
থ্যালাসেমিয়া মেজরে আক্রান্ত রোগীদের শরীর থেকে অতিরিক্ত আয়রন বের করতে আজীবন নিয়মিত রক্ত সঞ্চালন ও ব্যয়বহুল ওষুধের ওপর নির্ভর করতে হয়। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ক্রমাগত অগ্রগতি এখন নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন (Bone Marrow Transplant) এই রোগ থেকে স্থায়ী মুক্তির কার্যকর উপায় প্রমাণিত হয়েছে। এছাড়া, আধুনিক জিন থেরাপি (Gene Therapy) নিয়ে চলমান গবেষণাও ভবিষ্যতের চিকিৎসায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। যদিও এই উন্নত চিকিৎসাগুলোর আকাশছোঁয়া খরচ এবং সীমিত লভ্যতা এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রতিরোধেই মুক্তি: আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব
থ্যালাসেমিয়া একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগ। সচেতনতা, বিয়ের আগে বা সন্তান নেওয়ার আগে রক্ত পরীক্ষা এবং সঠিক জেনেটিক কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে এই রোগের বংশগত বিস্তার রোধ করা সম্ভব। এখন আর শুধু আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসার জন্য অপেক্ষা করা নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত করতে প্রতিরোধকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার সময় এসেছে।