বিদেশিদের অনুমতি মেলে, ভারতীয়দের কেন নয়? ভারতের রহস্যময় ‘নো এন্ট্রি জোন’

নিজের দেশ, অথচ সেখানে পা রাখা বারণ! শুনতে অদ্ভুত লাগলেও ভারতের মানচিত্রে এমন কিছু এলাকা রয়েছে, যেখানে সাধারণ ভারতীয়দের প্রবেশাধিকার নেই। নিরাপত্তা, আদিবাসী সুরক্ষা এবং স্পর্শকাতর সীমান্তের কারণে এই জায়গাগুলোকে ‘নো এন্ট্রি জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে, কিছু ক্ষেত্রে কঠোর সরকারি পারমিট নিয়ে বিদেশি পর্যটকরা সেখানে প্রবেশের সুযোগ পেলেও, ভারতীয় নাগরিকদের জন্য তা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
কেন এমন বৈষম্য? মূলত তিনটি বড় কারণে এই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে প্রশাসন:
জাতীয় নিরাপত্তা: চীন বা পাকিস্তান সীমান্ত সংলগ্ন স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে কড়া নজরদারি থাকে।
আদিবাসী সুরক্ষা: ‘আন্দামান আদিবাসী সুরক্ষা বিধি ১৯৫৬’ অনুযায়ী, কিছু বিচ্ছিন্ন উপজাতির সুরক্ষায় বাইরের মানুষের যোগাযোগ নিষিদ্ধ। বাইরের মানুষের সংস্পর্শে তাদের প্রাণহানি পর্যন্ত হতে পারে।
পরিবেশ রক্ষা: কিছু জায়গায় বিরল প্রাণী বা সক্রিয় আগ্নেয়গিরি রয়েছে, যার ক্ষতি রুখতে সাধারণের ভিড় নিষিদ্ধ।
আপনার অজানার ভুবনে থাকা সেই ৫টি নিষিদ্ধ এলাকা একনজরে:
১. নর্থ সেন্টিনেল আইল্যান্ড, আন্দামান: পৃথিবীর অন্যতম বিচ্ছিন্ন আদিবাসী ‘সেন্টিনেলিজ’ উপজাতির বাস এখানে। বাইরের মানুষকে দেখলেই তীর ছোঁড়ার ইতিহাস তাদের দীর্ঘদিনের। ২০১৮ সালে এক আমেরিকান মিশনারির মৃত্যু হয়েছিল এখানে। ভারত সরকার দ্বীপের ৫ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে।
২. ব্যারেন আইল্যান্ড, আন্দামান: ভারতের একমাত্র সক্রিয় আগ্নেয়গিরি এখানে অবস্থিত। লাভা বা বিষাক্ত গ্যাসের ঝুঁকি এড়াতে ভারতীয় টুরিস্টদের এখানে নামা নিষেধ। শুধুমাত্র দূর থেকে বোট থেকে আগ্নেয়গিরি দেখা সম্ভব। তবে বিজ্ঞানী ও বিদেশি গবেষকরা বিশেষ পারমিটে যেতে পারেন।
৩. ছাংথাং ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারির কোর জোন, লাদাখ: তিব্বতি বন্য গাধা ‘কিয়াং’ এবং তুষার চিতার বাসস্থান এই এলাকা। চীন সীমান্তের কাছে হওয়ায় এটি ‘ইনার লাইন পারমিট’ (ILP) এর আওতায় পড়ে। বিদেশিরা গাইডের সহায়তায় নির্দিষ্ট রুটে যাওয়ার সুযোগ পেলেও, ভারতীয়দের কোর জোনে প্রবেশ নিষিদ্ধ।
৪. গুরুদংমার লেকের কাছের সামরিক এলাকা, সিকিম: গুরুদংমার লেক পর্যন্ত পর্যটকদের যাওয়ার অনুমতি থাকলেও, চীন সীমান্ত লাগোয়া পাহাড়ি এলাকাটি ‘প্রোটেক্টেড এরিয়া’। এখানে ক্যামেরা বা মোবাইল নিয়ে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষেধ। সুরক্ষার খাতিরে বিদেশি পর্যটকদের PAP পারমিট দিয়ে নির্দিষ্ট পয়েন্ট পর্যন্ত অনুমতি দেওয়া হয়।
৫. জারোয়া রিজার্ভ ফরেস্ট, আন্দামান: আন্দামানের আদিবাসী ‘জারোয়া’দের সুরক্ষায় ১০২৮ বর্গ কিমি জঙ্গল সংরক্ষিত। আন্দামান ট্রাঙ্ক রোড থেকে এই জঙ্গলের গভীরে ঢোকা ভারতীয়দের জন্য আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। যদিও বিশেষ অনুমতি নিয়ে বিদেশি ডকুমেন্টারি টিম দূর থেকে শুটিংয়ের সুযোগ পায়।
উপায় কী?
সরাসরি যাওয়া নিষেধ হলেও দূর থেকে রহস্যের স্বাদ নেওয়া সম্ভব। যেমন— নর্থ সেন্টিনেল দ্বীপের ৫ নটিক্যাল মাইল দূর থেকে বোটে ঘোরা, ব্যারেন আইল্যান্ড দূর থেকে দেখা বা ছাংথাংয়ের বাফার জোনে ক্যাম্প করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নিষেধাজ্ঞা কোনো বৈষম্য নয়, বরং জাতীয় স্বার্থে সুরক্ষা। সেন্টিনেলিজদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা, সীমান্ত রক্ষা এবং পরিবেশ বাঁচাতেই এই কড়াকড়ি। বিদেশিদের ওপর কড়া নজরদারি থাকে বলেই তাদের সীমিত ক্ষেত্রে প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়।