মমতার দলে ভাঙনের নেপথ্যে কি দিল্লিতে শুভেন্দুর সেই বৈঠক? জেনেনিন বিশ্লেষণ

দিল্লির পশ্চিমবঙ্গ ভবনে ঘটে যাওয়া মাত্র কয়েক মিনিটের একটি সংক্ষিপ্ত এবং আপাত অনানুষ্ঠানিক বৈঠক যে ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল তৃণমূল কংগ্রেসে এতটা বড়সড় ভূমিকম্প ডেকে আনবে, তা হয়তো কেউ কল্পনাও করেনি। গত ২২ মে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং তৃণমূল বিধায়ক ঋতব্রত ব্যানার্জীর সেই সাক্ষাতের মাত্র ১৩ দিনের মাথায় এক নজিরবিহীন সংকটের মুখোমুখি দলটি। তৃণমূলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে প্রায় ৬০ জনই এখন দলীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে বিধানসভায় নতুন নেতৃত্বের দাবি তুলেছেন। ফলে, ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর গত ২৮ বছরের ইতিহাসে এই প্রথমবার আনুষ্ঠানিক ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে মমতা ব্যানার্জীর দল।
নির্বাচনের পর থেকেই জমছিল অসন্তোষ
গত ৪ মে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই তৃণমূলের অন্দরে চাপা অস্বস্তি দানা বাঁধছিল। দলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে নেতাদের উপস্থিতি ক্রমান্বয়ে কমতে শুরু করে। দলীয় নেতৃত্ব, সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের একচ্ছত্র ক্ষমতা নিয়ে অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ বাড়ছিল। বিশেষ করে, দলের ক্ষমতার ভারসাম্য এবং মমতা ব্যানার্জীর ভাতিজা অভিষেক ব্যানার্জীর ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে দলের একাংশের মধ্যে তীব্র প্রশ্ন উঠতে থাকে। আর এই অসন্তোষেরই বিস্ফোরণ ঘটল দিল্লির একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে।
দিল্লির সেই ‘১৩ মিনিটের’ রহস্যময় সাক্ষাৎ
গত ২২ মে দিল্লির পশ্চিমবঙ্গ ভবনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও উলুবেড়িয়া পূর্বের তৃণমূল বিধায়ক ঋতব্রত ব্যানার্জীর মধ্যে একটি আচমকা সাক্ষাৎ হয়। বিধায়ক ঋতব্রত ব্যানার্জীর দাবি অনুযায়ী, সাক্ষাৎটি ছিল স্রেফ কয়েক মিনিটের এবং সম্পূর্ণ অনানুষ্ঠানিক। মুখ্যমন্ত্রী কেবল তাঁর খোঁজখবর নেন এবং সরকারি আবাসন সংক্রান্ত কিছু প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে কথা বলেন। পাশাপাশি বিরোধী দলের বিধায়কদের প্রশাসনিক বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে বলেও মুখ্যমন্ত্রী উল্লেখ করেন।
প্রাথমিকভাবে উভয় পক্ষ এটিকে ‘সাধারণ সৌজন্য সাক্ষাৎ’ বলে উড়িয়ে দিতে চাইলেও, বাংলার রাজনৈতিক মহলে জল্পনার আগুন জ্বলতে সময় লাগেনি।
নাটকীয় মোড়: স্পিকারের স্বীকৃতি ও নতুন বিরোধী দলনেতা
দিল্লির সেই সাক্ষাতের পর পরিস্থিতি রকেটের গতিতে বদলাতে শুরু করে। আচমকাই তৃণমূলের অন্দরে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর প্রধান মুখ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ঋতব্রত ব্যানার্জী। তাঁর নেতৃত্বে ৬০ জন বিধায়ক একজোট হয়ে বিধানসভার স্পিকারের কাছে নিজেদের স্বাক্ষর জমা দেন। স্পিকারও কালক্ষেপ না করে তাঁদের এই নতুন অবস্থানকে স্বীকৃতি দেন এবং বিধানসভায় তাঁদের জন্য পৃথক আসন বরাদ্দ করেন। এর পরপরই বিদ্রোহী বিধায়কেরা ঋতব্রত ব্যানার্জীকে তাঁদের ‘বিরোধীদলীয় নেতা’ নির্বাচিত করেন, যা তৃণমূলের বর্তমান আইনসভা কাঠামোকে কার্যত তাসের ঘরের মতো গুঁড়িয়ে দিয়েছে।
এক নজরে বর্তমান সমীকরণ:
মোট তৃণমূল বিধায়ক: ৮০ জন
বিদ্রোহী বিধায়ক: ৬০ জন (দাবি অনুযায়ী)
নতুন বিরোধী দলনেতা: ঋতব্রত ব্যানার্জী
দল বাঁচাতে মরিয়া মমতা: সব কমিটি ভাঙার নির্দেশ
বিধানসভায় এই অতর্কিত অভ্যুত্থানের পরই নড়েচড়ে বসেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা ব্যানার্জী। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে তিনি এক জরুরি ও নজিরবিহীন পদক্ষেপ ঘোষণা করেছেন। গোটা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে দলের সমস্ত সাংগঠনিক কমিটি এবং সহযোগী সংগঠনের শাখা কমিটি একযোগে ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্রোহীদের হাত থেকে দলের রাশ পুনরায় নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতেই মমতার এই ‘মাস্টারস্ট্রোক’। তবে এই চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনও ধোঁয়াশায় ঢাকা।
⏳ তৃণমূলের ইতিহাসে এক নতুন ও অনিশ্চিত অধ্যায়
১৯৯৮ সালে কংগ্রেসের হাত ছেড়ে মমতা ব্যানার্জী যখন তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেছিলেন, তারপর থেকে দীর্ঘ ২৮ বছরে বহু ঝড়-ঝাপটা গেছে এই দলের ওপর দিয়ে। কিন্তু ক্ষমতার অন্দরে এমন আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিভাজনের রূপ দলটিকে আগে কখনও দেখতে হয়নি। এই সাম্প্রতিক বিদ্রোহ কেবল তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলকেই হাটে হাঁড়ি ভেঙে প্রকাশ্যে আনেনি, বরং সামগ্রিকভাবে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সমীকরণকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বাংলার মসনদ আর দলীয় আনুগত্যের এই লড়াই শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার।