“আমরা তো উদ্বাস্তু নই!” দলিল-খাজনা সবই বৈধ, তাও কেন রেলের কোপ? ফুঁসছে হুগলির কোলা গ্রাম

সরকারি পাট্টা দেওয়া জমিতে এবার রেলের উচ্ছেদের নোটিশ! আকস্মিক এই ঘটনায় তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে হুগলির মগরা ১ নম্বর পঞ্চায়েতের কোলা গ্রামে। ব্যান্ডেল থার্মাল পাওয়ারের রেল লাইনের দু-পাশে থাকা প্রতিটি বাড়িতে রেলের তরফ থেকে উচ্ছেদের নোটিশ জারি হতেই, নিজেদের ভিটেমাটি হারানোর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন কয়েকশো পরিবার।
পূর্বরেলের পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে, চলতি মাসের ১১ জুনের মধ্যে ওই জায়গা খালি করে দিতে হবে। আর এই নির্দেশ ঘিরেই দানা বেঁধেছে চরম বিতর্ক। প্রশ্ন উঠছে, রাজ্য সরকারের দেওয়া বৈধ পাট্টা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে রেল সেখানে উচ্ছেদের নোটিশ পাঠাতে পারে?
ফিরে দেখা ইতিহাস: জমিটি আসলে কার?
অনুসন্ধানে জানা যাচ্ছে, বিতর্কিত এই জমিটি একসময় ছিল ‘বেঙ্গল প্রভিন্সিয়াল রেলওয়ে’ (BPR)-র অন্তর্গত। ১৮৯০ সালে গঠিত এই সংস্থাটি ছিল সম্পূর্ণ বাঙালি মালিকানাধীন এবং পরিচালিত প্রথম বেসরকারি রেলওয়ে। হুগলির মগরা থেকে তারকেশ্বর পর্যন্ত প্রায় ৩৩ মাইল দীর্ঘ এই ন্যারো-গেজ রেলপথটি ব্যবসা ও তীর্থযাত্রীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পরবর্তীতে ১৯৫৬ সাল নাগাদ এই রেল পরিষেবা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।
এরপর দীর্ঘ সময় ধরে জমিটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকার পর, ১৯৯৮ সালে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার জমিটি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করে। এই বিপিআর রেলের জমিতেই গড়ে ওঠে মগরা বিডিও অফিস, মৎস্য-শিক্ষা বিভাগ ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র-সহ একাধিক সরকারি দফতর। এরপর ২০০৪ সালে ভূমি অধিগ্রহণ আইনের অধীনে সরকার প্রায় ২ একর জমি (১৪৬২ নম্বর দাগ) সাধারণ ভূমিহীন মানুষদের পাট্টা হিসেবে দেয়। বর্তমানে গ্রামবাসীরা সেই জমির নিয়মিত খাজনা দেন, তাঁদের বিদ্যুৎ-গ্যাস-জলের সংযোগ রয়েছে এবং অনেকেই সরকারি আবাস যোজনার সুবিধাও পেয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘ ২২ বছর পর হঠাৎ করেই পূর্বরেল এই জমি নিজেদের দাবি করে বসামাত্রই তৈরি হয়েছে আইনি ও রাজনৈতিক জটিলতা।
কী বলছেন স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা?
এই বিষয়ে মগরা ১ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান রঘুনাথ ভৌমিক দাবি করেছেন, রেলের তরফ থেকে কোথাও একটা বড়সড় ভুল হচ্ছে। তিনি বলেন, “বিপিআর রেল মানেই ভারতীয় রেল নয়, ওটি একটি ব্যক্তিগত উদ্যোগ ছিল। রাজ্য সরকার আইনি পথেই এই জমি অধিগ্রহণ করে সাধারণ মানুষকে পাট্টা দিয়েছে। এর আগে বহুবার পঞ্চায়েতের সঙ্গে বৈঠকে বসেও রেল কর্তৃপক্ষ এই জমির মালিকানার সপক্ষে কোনও অকাট্য প্রমাণ দিতে পারেনি। আমরা রেল এবং রাজ্য সরকার— উভয়ের কাছেই আবেদন জানিয়েছি যাতে সাধারণ মানুষ বিপদে না পড়েন।” ইতিমদ্যেই বলাগড়ের বিধায়ক এসে স্থানীয়দের পাশে দাঁড়িয়ে রেলের সঙ্গে কথা বলার আশ্বাস দিয়েছেন।
কান্নায় ভেঙে পড়েছেন ঘরহারা হওয়ার আশঙ্কায় থাকা বাসিন্দারা:
ইতিমধ্যেই ৭০টিরও বেশি পরিবারকে এই উচ্ছেদের নোটিশ ধরানো হয়েছে। এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা লক্ষ্মীনারায়ণ রায় ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে বলেন, “১৯৬৮ সাল থেকে আমরা এখানে আছি। ২০০৪ সালে বাম আমলে পাট্টা পেয়েছি। জমির খাজনা, জলের কর, বিদ্যুতের বিল— সব ঠিকঠাক দিই। হঠাৎ পূর্বরেল বলছে এই জায়গা তাদের! ত্রিবেণী থেকে মগরা পর্যন্ত প্রায় ৪০০ পরিবার রয়েছে। এই বয়সে উচ্ছেদ হলে আমরা যাব কোথায়?”
একই সুর শোনা গেল স্থানীয় বাসিন্দা রীতা দত্তের গলায়। তিনি বলেন, “হুট করে একটা নোটিশ দিয়ে গেল। আমার শ্বশুরমশাইরা ৬০ বছর ধরে এখানে বাস করছেন। আমরা তো চোর-ডাকাত বা উদ্বাস্তু নই যে যেখানে-সেখানে চলে যাব! যদি উচ্ছেদ করতেই হয়, তবে সরকার আগে আমাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করুক।”
আপাতত ১১ জুনের ডেডলাইন সামনে রেখে মগরার কোলা গ্রামে রাতারাতি নেমে এসেছে অন্ধকারের ছায়া। একদিকে মাথার ছাদ বাঁচানোর লড়াই, অন্যদিকে রেল ও রাজ্যের আইনি দড়িটানাটানি— সব মিলিয়ে এক চরম মানবিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে হুগলির এই জনপদ।