দেবী অন্নপূর্ণা কে? কেন চৈত্র মাসে ঘরে ঘরে হয় অন্নপূর্ণার আরাধনা? জানুন পৌরাণিক কাহিনী

বসন্তের বিদায় ও চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষ অষ্টমী:
বসন্তের বিদায়লগ্নে এবং চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষ অষ্টমী তিথিতে ঘরে ঘরে মা অন্নপূর্ণার আরাধনায় মেতে ওঠেন বাঙালি। কিন্তু এই উৎসবের গভীরে লুকিয়ে আছে এক অত্যন্ত গভীর জীবনদর্শন। দেবী অন্নপূর্ণা মূলত আদিশক্তি বা পার্বতীরই এক বিশেষ রূপ। ‘অন্ন’ মানে অন্ন বা খাদ্য এবং ‘পূর্ণা’ মানে যিনি পরিপূর্ণ। অর্থাৎ, তিনি সৃষ্টির অন্নদাত্রী।

পৌরাণিক কাহিনী ও জীবনদর্শন:
পৌরাণিক আখ্যান অনুযায়ী, একবার শিব ও পার্বতীর মধ্যে এক তাত্ত্বিক বিতর্ক বেঁধেছিল। শিবের মতে, পৃথিবী এবং এর সমস্ত বস্তুগত উপদান—খাদ্য, অর্থ, সম্পদ—সবই ‘মায়া’ বা বিভ্রম। পরম সত্য কেবল আধ্যাত্মিকতা। পার্বতী এই মতবাদে সম্পূর্ণ একমত হতে পারেননি। তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, দেহকে টিকিয়ে না রাখলে আধ্যাত্মিকতার সাধনা অসম্ভব। শরীর রক্ষার জন্য অন্ন বা খাদ্যের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।

নিজের গুরুত্ব প্রমাণ করতে পার্বতী পৃথিবী থেকে অন্তর্ধান করেন। ফলস্বরূপ, মর্ত্যলোকে নেমে আসে তীব্র দুর্ভিক্ষ, খরা ও হাহাকার। ক্ষুধার জ্বালায় অস্থির হয়ে শিব যখন অন্ন অন্বেষণ করতে থাকেন, তখন তিনি বুঝতে পারেন বস্তুগত জগতকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা যায় না। অবশেষে কাশীতে তিনি অন্নপূর্ণা রূপে পার্বতীকে দেখতে পান এবং নিজের ভুল স্বীকার করে অন্ন ভিক্ষা করেন। দেবী হাসিমুখে তাঁকে আহার করান এবং পৃথিবী দুর্ভিক্ষ থেকে মুক্তি পায়।

কেন এই পুজো আজও প্রাসঙ্গিক?
১. জীবনের ভারসাম্য: এই কাহিনী আমাদের শেখায় যে, আধ্যাত্মিকতা ও পার্থিব অস্তিত্বের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই জীবনের প্রকৃত পথ।
২. অন্নদান: দেবী অন্নপূর্ণার মাহাত্ম্য ছড়িয়ে আছে বিশ্বজুড়ে। বেনারসের অন্নপূর্ণা মন্দিরে আজও কেউ অভুক্ত থাকেন না। এই পুজোর মাধ্যমে সমাজে অন্নদানের মহিমা ও ক্ষুধার্তকে সেবা করার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

প্রতি বছর এই তিথিতে অন্নপূর্ণা আরাধনার মধ্য দিয়ে আমরা কেবল মাকেই পূজা করি না, বরং পৃথিবীর অন্নদাত্রী প্রকৃতির প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। চৈত্র মাসের এই বিশেষ দিনে অন্নপূর্ণা পূজা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অন্নই ব্রহ্ম—অন্ন ছাড়া জীবন অসম্ভব।