পেট খারাপ বা গ্যাসের সমস্যা? কোলনের ভেতরে লুকিয়ে নেই তো এই ২ ঘাতক মাংসপিণ্ড! ৫ গুণ বাড়ায় ক্যানসারের ঝুঁকি

অন্ত্রের ক্যানসার বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘কোলোরেক্টাল ক্যানসার’ (Colorectal Cancer) বর্তমানে বিশ্বজুড়ে অন্যতম এক নীরব ঘাতক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই মারণ রোগের ভয়াবহতা কতটা, তা কেবল একটি তথ্য থেকেই স্পষ্ট—অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশে ক্যানসারজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে এটি দ্বিতীয় প্রধান কারণ। আর বিশ্বজুড়ে সর্বাধিক চিহ্নিত ক্যানসারগুলির তালিকায় এর স্থান চতুর্থ।
এই মারণ রোগটি ঠিক কীভাবে শরীরে বাসা বাঁধে, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চালাচ্ছিলেন বিজ্ঞানীরা। সম্প্রতি সেই গবেষণায় উঠে এসেছে এক হাড়হিম করা তথ্য। গবেষকরা জানিয়েছেন, মানুষের অন্ত্রে বেড়ে ওঠা দুই নির্দিষ্ট ধরনের মাংসল বৃদ্ধি বা ‘পলিপ’ (Polyp) অন্ত্রের ক্যানসারের ঝুঁকি এক ধাক্কায় প্রায় পাঁচ গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে।
পলিপ আসলে কী এবং এর বিপজ্জনক রূপ কোনটি?
সহজ ভাষায়, পলিপ হলো অন্ত্রের ভেতরের দেওয়ালে বা আস্তরণে তৈরি হওয়া এক ধরণের ছোট মাংসল পিণ্ড। প্রাথমিক অবস্থায় এই বৃদ্ধিগুলি শরীরের কোনো তাৎক্ষণিক ক্ষতি করে না এবং এগুলি সম্পূর্ণ যন্ত্রণাহীন ও ক্ষতিকারকহীন বা ‘বিনাইন’ অবস্থায় থাকে। তবে বিপদ লুকিয়ে থাকে এর ভবিষ্যতের রূপান্তরের মধ্যে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, দুই ধরনের নির্দিষ্ট পলিপ—যাদের নাম ‘অ্যাডেনোমা’ (Adenoma) এবং ‘সেরেটেড’ (Serrated) পলিপ, এগুলি সময়ের সাথে সাথে অন্ত্রের ভেতরেই ক্যানসারে রূপান্তরিত হওয়ার প্রবল ক্ষমতা রাখে।
ফ্লিন্ডার্স ইউনিভার্সিটির গবেষণায় আশ্চর্য তথ্য
এই যুগান্তকারী ও গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন ফ্লিন্ডার্স ইউনিভার্সিটি এবং ফ্লিন্ডার্স মেডিক্যাল সেন্টারের একদল বিশেষজ্ঞ গবেষক। এই অনুসন্ধানের জন্য তাঁরা দীর্ঘ সময় ধরে প্রায় ৮,৪০০-এরও বেশি কোলোনোস্কোপি রেকর্ড অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পরীক্ষা ও বিশ্লেষণ করেছেন। আর তাতেই উঠে এসেছে এক চমকপ্রদ তথ্য।
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যেসব রোগীদের অন্ত্রে ‘সেরেটেড’ পলিপের উপস্থিতি ছিল, তাঁদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক রোগীর শরীরেই পাশাপাশি ‘অ্যাডেনোমা’ পলিপও পাওয়া গিয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, এই দুই বিপজ্জনক পলিপের একই সাথে শরীরে অবস্থান করা অত্যন্ত উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ একটি সংমিশ্রণ। বিশেষজ্ঞরা যতটা আশঙ্কা করেছিলেন, বাস্তবে এই দুই পলিপের সহাবস্থান তার চেয়েও অনেক বেশি সাধারণ এবং সচরাচর মানুষের শরীরে ঘটছে। এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার ফলাফলটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের সুপ্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘ক্লিনিক্যাল গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি অ্যান্ড হেপাটোলজি’ (Clinical Gastroenterology and Hepatology)-তে প্রকাশিত হয়েছে।
মারণ রোগ প্রতিরোধের উপায় কী?
গবেষকদের বক্তব্য অনুযায়ী, অন্ত্রের ক্যানসারকে জয় করার বা প্রতিহত করার একমাত্র এবং সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হলো প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় করা। যেহেতু এই পলিপগুলি শুরুতে কোনো গুরুতর উপসর্গ দেখায় না, তাই নিয়মিত ব্যবধানে ‘কলোনোস্কোপি’ (Colonoscopy) পরীক্ষার মাধ্যমে অন্ত্রের পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি।
সময়মতো পরীক্ষার মাধ্যমে যদি এই বিপজ্জনক পলিপগুলিকে শনাক্ত করে শরীর থেকে অপসারণ করা যায়, তবে ক্যানসারের ঝুঁকি প্রায় সম্পূর্ণ এড়ানো সম্ভব। চিকিৎসকদের পরামর্শ, বয়স ৪৫ পেরোলে কিংবা পরিবারে ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে অবহেলা না করে নিয়মিত স্ক্রিনিং করানোই সুস্থ থাকার একমাত্র উপায়।