মাঝরাতে ফুটপাতে ফেলে পালাল ট্যাক্সি! টাকার অভাবে হাসপাতাল থেকেও বিতাড়িত একসময়ের রূপোলি পর্দার ‘কুইন’

সিনেমার পর্দায় কতই না রোমহর্ষক হিরোইজম দেখা যায়। কিন্তু রূপোলি পর্দার জমকালো আলোর পেছনে যে কতটা ঘন অন্ধকার লুকিয়ে থাকে, তা আরও একবার প্রমাণ করল এক মর্মান্তিক বাস্তব। মাঝরাতে হায়দরাবাদের এক ফাঁকা রাস্তায়, আলো-আঁধারির মধ্যে ফুটপাতে অসহায় অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা গেল এক বৃদ্ধাকে। পথচারীরা প্রথমে চিনতে না পারলেও পরে জানা যায়, ইনি কোনো সাধারণ মানুষ নন—এককালে নিজের অভিনয়ে পর্দা কাঁপানো তেলুগু সিনেমা জগতের পরিচিত মুখ পাবলা শ্যামল (Pavala Shyamala)।
টাকার অভাব এবং কর্পোরেট হাসপাতালের নির্মমতায় কীভাবে একজন জনপ্রিয় তারকাকে ফুটপাতে এসে দাঁড়াতে হয়, সেই ট্র্যাজেডির সাক্ষী থাকল হায়দরাবাদ। তবে বাস্তব জীবনের এই কঠিন পরিস্থিতিতে দেবদূত হয়ে এগিয়ে এলেন দক্ষিণী ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির নামী প্রযোজক তথা ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান দিল রাজু (Dil Raju)।
কী ঘটেছিল সেই অভিশপ্ত রাতে?
দীর্ঘদিন ধরেই হৃদ্রোগের সমস্যায় ভুগছেন প্রবীণ অভিনেত্রী পাবলা শ্যামল। সম্প্রতি তাঁর শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হলে তাঁকে কুকাতপল্লির একটি নামী বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান চিকিৎসা ব্যবস্থার বাণিজ্যিকীকরণের যুগে যে মানবিকতার চেয়ে টাকার দাম বেশি, তা হাতেনাতে টের পেলেন তিনি। পর্যাপ্ত অর্থ না থাকা এবং বিমা সংক্রান্ত জটিলতার অজুহাত দেখিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁকে ভরতি নিতে স্পষ্ট অস্বীকার করে।
এরপর হাসপাতাল থেকেই তাঁর জন্য একটি ট্যাক্সির ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। কিন্তু নির্মমতার এখানেই শেষ নয়। মাঝরাস্তায় এসে সেই ট্যাক্সিচালকও অসুস্থ, অসহায় প্রবীণ অভিনেত্রীকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়ে চম্পট দেয়। গভীর রাতে হায়দরাবাদের নির্জন রাস্তায় সম্পূর্ণ একা, বিভ্রান্ত অবস্থায় পড়েছিলেন তিনি। পরে কিছু সহৃদয় পথচারী তাঁকে ওই অবস্থায় দেখে পুলিশে খবর দেন। পুলিশ এসে তাঁকে উদ্ধার করে ‘আরকে ফাউন্ডেশন’ নামের একটি স্থানীয় আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যায়।
ত্রাতা হয়ে এগিয়ে এলেন দিল রাজু
সোশ্যাল মিডিয়ায় এই খবর চাউর হতেই তেলুগু ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির অন্দরে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় ওঠে। ঘটনাটি কানে যাওয়া মাত্রই আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করেননি প্রযোজক দিল রাজু। তিনি দ্রুত নিজের সহকারী দলকে হাসপাতালে পাঠান এবং চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে প্রবীণ অভিনেত্রীর চিকিৎসার সমস্ত খরচ নিজের কাঁধে তুলে নেন। সম্প্রতি সামনে আসা একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, এই কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ানোর জন্য পাবলা শ্যামল ও তাঁর মেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন এবং প্রযোজককে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।
দীর্ঘদিনের দারিদ্র্যের লড়াই
১৯৮৫ সাল থেকে ‘গোলিমার’, ‘বর্ষম’, ‘অন্ধ্রওয়ালা’র মতো একাধিক ব্লকবাস্টার ছবিতে সহ-অভিনেত্রী এবং কমেডি চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের মন জিতেছিলেন পাবলা শ্যামল। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে চরম দারিদ্র্য তাঁর নিত্যসঙ্গী। তাঁর একমাত্র মেয়েও দীর্ঘদিন ধরে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী।
এর আগে ২০২১ সালে নামী পরিচালক জুটি রাজ ও ডিকে (Raj & DK) সমাজমাধ্যমে তাঁর জন্য আর্থিক তহবিলের আবেদন জানিয়েছিলেন। তখনই জানা যায়, নিজের ও মেয়ের চিকিৎসার খরচ চালাতে জীবনের সমস্ত স্মারক ও ট্রফি পর্যন্ত বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। এমনকি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরেও পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ রূপ নেয় যে, বাড়িভাড়া দিতে না পারায় মা-মেয়েক ঘর থেকে বার করে দেওয়া হয় এবং তাঁরা রাস্তায় এসে বসেন। তখনও পুলিশই তাঁদের উদ্ধার করে ওই আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে গিয়েছিল।
‘আরকে ফাউন্ডেশন’-এর তরফে জানানো হয়েছে, গত দুই-তিন বছর ধরে বিনামূল্যে সেখানেই তাঁর সাধারণ চিকিৎসা চলছিল। তবে হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ না থাকায় এবার বড় হাসপাতালে যেতে হয়েছিল তাঁকে, আর সেখানেই মুখোমুখি হতে হলো এই চরম লাঞ্ছনার। অতীতে চিরঞ্জীবী, পবন কল্যাণ বা অল্লু অর্জুনের মতো মহাতারকারা তাঁকে বিভিন্ন সময়ে সাহায্য করলেও, বার্ধক্যের এই শেষলগ্নে এসে একসময়ের নামী অভিনেত্রীর এই পথ-বিভ্রাট আরও একবার বুঝিয়ে দিল—গ্ল্যামার দুনিয়ার আলো নিভে যাওয়ার পর বাস্তব জীবন কতটা নিষ্ঠুর ও কঠিন হতে পারে।