ফলতায় মেগা ডার্বি! অভিষেকের গড়ে দাঁড়িয়ে ঠিক কী করতে চলেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু?

২১শে মে ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের হাইভোল্টেজ পুনর্নির্বাচন। আর তার ঠিক আগেই বাংলার রাজনৈতিক পারদ চড়চড়িয়ে বাড়িয়ে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। দায়িত্ব নেওয়ার পর এই প্রথমবার ফলতায় পা রাখছেন তিনি। ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত এই বিধানসভা এলাকাতেই আজ, শনিবার বিজেপি কর্মীদের মুখোমুখি হয়ে এক হাইপ্রোফাইল রাজনৈতিক জনসভায় ভাষণ দিতে চলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, নবান্নের কুর্সিতে বসার পর এটাই হতে চলেছে শুভেন্দুর প্রথম সবথেকে বড় এবং তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক সমাবেশ।

স্বভাবতই এই সভাকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে তুমুল উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। কারণ, ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রটি তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্রের অন্যতম প্রধান দুর্গ। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের তদন্তে এই ফলতার ৬০টি বুথে মারাত্মক সব অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। কোথাও ইভিএমের বোতামে টেপ লাগিয়ে ভোটদানে বাধা দেওয়া হয়েছে, আবার কোথাও ভোটারদের বুথমুখো হতে দেওয়া হয়নি। এই পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতির জেরেই আগামী ২১শে মে এখানে পুনর্নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।

এই কেন্দ্রে তৃণমূলের টিকিটে লড়ছেন অভিষেকের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ তথা এলাকার দাপুটে নেতা জাহাঙ্গীর খান। বিজেপির সরাসরি অভিযোগ, মূল ভোটের দিন সাধারণ মানুষের উপর দেদার সন্ত্রাস চালানো হয়েছিল এবং বিরোধী শিবিরের হাত-পা বেঁধে কার্যত কোণঠাসা করে রাখা হয়েছিল।

বিজেপি সূত্রে খবর, ফলতা ৮৩ নম্বর বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন ফুটবল মাঠে এই কর্মীসভার আয়োজন করা হয়েছে। এখান থেকেই পুনর্নির্বাচনের প্রচারে কার্যত শেষ মুহূর্তের ঝড় তুলবেন শুভেন্দু অধিকারী। গেরুয়া শিবিরের দাবি, মুখ্যমন্ত্রীর এই সভাকে ঘিরে স্থানীয় সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উন্মাদনা তৈরি হয়েছে এবং এটি একটি ‘মেগা র‍্যালি’-র রূপ নিতে চলেছে।

বিজেপি নেতৃত্বের স্পষ্ট বক্তব্য, ফলতা জয় করা এখন আর পাঁচটা কেন্দ্রের মতো সাধারণ লড়াই নয়, এটা দলের কাছে প্রেস্টিজ ফাইট। এই কেন্দ্রে জিতলে বিধানসভায় বিজেপির আসনসংখ্যা ২০৭ থেকে বেড়ে ২০৮ হবে ঠিকই, কিন্তু আসল লক্ষ্য অন্য। বিজেপি দেখাতে চাইছে যে, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ডায়মন্ড হারবারে তৃণমূলের বিপুল মার্জিনে জয়ের নেপথ্যে আসলে ছিল দেদার কারচুপি আর বুথ দখল।

রেকর্ড খতিয়ান বলছে, ২০২৪-এর লোকসভায় ডায়মন্ড হারবার থেকে প্রায় ৭ লক্ষ ১০ হাজার ভোটে জিতেছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। শুধু ফলতা বিধানসভা কেন্দ্র থেকেই তিনি পেয়েছিলেন ১ লক্ষ ৬৮ হাজার ভোট, যা ছিল মোট সংগৃহীত ভোটের প্রায় ৮৯ শতাংশ। এই অবিশ্বাস্য সংখ্যাটা নিয়েই শুরু থেকেই প্রশ্ন তুলছিল বিজেপি। ৬০টি বুথে পুনর্নির্বাচন ঘোষণার পর সেই অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে।

ফলতা কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী দেবাংশু পান্ডার দাবি, রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই এলাকার সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে। তিনি বলেন, “আগে মানুষ মুখ খুলতে ভয় পেতেন। কিন্তু এখন পরিস্থিতি অন্য। সাধারণ মানুষ নিজেই রাস্তায় নেমে তৃণমূলের অত্যাচার ও ভোট লুটের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। শুভেন্দু-দার এই সভাকে কেন্দ্র করে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া সেটাই প্রমাণ করছে।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ফলতার এই পুনর্নির্বাচন এখন আর সাধারণ কোনো উপনির্বাচন বা একটা আসনের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। এটি আদতে ডায়মন্ড হারবার তথা দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজনৈতিক রাশ কার হাতে থাকবে, তা ঠিক করার লড়াই। একদিকে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসার পর শুভেন্দু অধিকারীর প্রথম বড় অগ্নিপরীক্ষা, অন্যদিকে নিজের খাসতালুক বাঁচাতে মরিয়া অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়— সব মিলিয়ে ২১শে মে-র আগে ফলতা এখন বঙ্গ রাজনীতির ভরকেন্দ্র।