দুল পরলেই খুলবে ভাগ্য? কান ফুটো করার পেছনে লুকিয়ে কোন ভয়ঙ্কর বৈজ্ঞানিক ও জ্যোতিষ রহস্য

আজকের প্রজন্মের কাছে কান ফুটো করা বা ইয়ার পিয়ার্সিং কেবলই ফ্যাশন স্টেটমেন্ট। মেয়েদের রকমারি দুল কিংবা ছেলেদের কানে স্টাইলিশ টপ—সবটাই এখন ট্রেন্ডের অংশ। কিন্তু আপনি কি জানেন, সনাতন হিন্দু ধর্মে একে শুধু সাজগোজের মাধ্যম হিসেবে দেখা হয় না? জন্মের পর মাথা মুন্ডন, উপনয়ন বা বিয়ের মতোই কান বিঁধানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রক্রিয়া। হিন্দু শাস্ত্রের ১৬টি প্রধান সংস্কারের মধ্যে ৯ নম্বর সংস্কার হলো এই ‘কর্ণভেদ সংস্কার’।
জ্যোতিষ শাস্ত্র এবং আধুনিক বিজ্ঞান—উভয়ই বলছে, সঠিক নিয়মে কান ফুটো করলে মানুষের ভাগ্য বদলে যেতে পারে। এর পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর বৈজ্ঞানিক ও আধ্যাত্মিক কারণ।
আসল গেমটা বুধের: কোন গ্রহ প্রসন্ন হন?
জ্যোতিষ শাস্ত্র অনুযায়ী, মানুষের কান মূলত সৌরজগতের ‘প্রিন্স’ বা বুধ গ্রহের প্রতিনিধিত্ব করে। বুদ্ধি, স্মৃতিশক্তি, চটজলদি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, ব্যবসায়িক বুদ্ধি, হিসাবনিকাশ এবং কথা বলার চাতুর্য—সবটাই নিয়ন্ত্রিত হয় বুধের দ্বারা।
কারও জন্মছক বা কুণ্ডলীতে বুধ দুর্বল বা পীড়িত থাকলে পড়াশোনায় মনোযোগের অভাব, ভুলে যাওয়ার প্রবণতা, কথার জড়তা বা তোতলামি, ব্যবসায় বারবার লোকসান এবং সামাজিক মেলামেশায় ভীতি (সোশ্যাল অ্যাংজাইটি) দেখা দেয়। শাস্ত্র বলছে, কানের লতিতে ফুটো করে সোনা বা রুপোর দুল পরলে বুধের নেতিবাচক প্রভাব কেটে যায় এবং বুধ প্রসন্ন হন।
পাশাপাশি, কানে রাহুরও অধিষ্ঠান রয়েছে বলে মনে করা হয়। রাহু মানুষকে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে এবং মানসিক অস্থিরতা বাড়ায়। কান ফুটো করলে রাহুর এই কুপ্রভাবও অনেকটাই কমে আসে।
শুধু গ্রহ নয়, লুকিয়ে আছে বিজ্ঞান ও আকুপ্রেশার
আয়ুর্বেদ এবং চিনা আকুপ্রেশার চিকিৎসায় কানের লতিকে ‘মাস্টার সেন্সর পয়েন্ট’ বলা হয়ে থাকে। চিকিৎসকদের মতে, কানের ঠিক লতির মাঝখানে ফুটো করলে মস্তিষ্কের স্মৃতিশক্তি এবং একাগ্রতা রক্ষাকারী অংশটি সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই পয়েন্টে উদ্দীপনা সৃষ্টি হলে ‘ভেগাস নার্ভ’ শান্ত হয়, যা মানসিক উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা এবং মাইগ্রেনের ব্যথা কমাতে সাহায্য করে।
ঠিক এই কারণেই প্রাচীনকালে গুরুকুলে পড়াশোনা করতে পাঠানোর আগে ছাত্রদের কান ফুটো করে দেওয়া হতো, যাতে তাদের মেধা ও ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
জ্যোতিষ ও বিজ্ঞানের নিরিখে কর্ণভেদের ৫টি ম্যাজিক উপকারিতা
-
বুদ্ধি ও স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি: পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়াতে এবং স্মৃতিশক্তি তীক্ষ্ণ করতে শিশুদের কান ফুটো করা অত্যন্ত কার্যকর।
-
কথার জড়তা দূর হওয়া: বুধের দোষের কারণে যাঁদের কথা বলতে সমস্যা হয় বা সঠিক শব্দ খুঁজে পান না, কান ফুটো করলে তাঁদের বাচনভঙ্গি উন্নত হয়।
-
ব্যবসায় উন্নতি: বুধ ব্যবসার কারক গ্রহ হওয়ায় কান ফুটো করার ফলে বিপণন (মার্কেটিং) ও ক্লায়েন্ট ডিলিংয়ের ক্ষমতা বাড়ে।
-
রাহুর দশা থেকে মুক্তি: আকস্মিক দুর্ঘটনা, বদনাম কিংবা কুঅভ্যাস থেকে মুক্তি দিতে সাহায্য করে এই প্রক্রিয়া।
-
প্রজনন ক্ষমতা বৃদ্ধি: আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের মতে, কানের নির্দিষ্ট কিছু স্নায়ু জরায়ুর সাথে যুক্ত। ফলে মেয়েদের ঋতুস্রাবের কষ্ট কমে এবং প্রজনন ক্ষমতা বাড়ে।
কখন এবং কীভাবে করবেন কর্ণভেদ?
শাস্ত্র মতে, শিশুদের ১, ৩ অথবা ৫ বছর বয়সে কর্ণভেদ করা সবচেয়ে শ্রেয়। বিজয়া দশমী, অক্ষয় তৃতীয়া, পুষ্য নক্ষত্র এবং বুধবার এই কাজের জন্য অত্যন্ত শুভ দিন। তবে মঙ্গলবার, শনিবার এবং অমাবস্যার দিনটি এড়িয়ে চলাই ভালো।
ফ্যাশনেবল বা সস্তার দুল পরে এই উপকার পাওয়া যায় না। খাঁটি সোনা বা রুপোর ছোট রিং বা টপ পরা সবচেয়ে ভালো। সোনা পরলে বুধ ও বৃহস্পতি উভয় গ্রহই তুষ্ট হয়। আর রুপো পরলে চন্দ্রের প্রভাবে মন শান্ত থাকে।
মেয়েদের ক্ষেত্রে দুই কানেই ফুটো করা বাধ্যতামূলক। ছেলেদের ক্ষেত্রে ডান কানে ফুটো করলে সূর্যের তেজ ও সাহস বাড়ে, আর বাঁ কানে ফুটো করলে চন্দ্রের প্রভাবে মন শান্ত হয়। তবে বর্তমান যুগের জ্যোতিষীদের মতে, ছেলেরা চাইলে দুই কানেই ফুটো করতে পারেন। অভিজ্ঞ কাউকে দিয়ে অথবা আধুনিক মেশিনে ফুটো করা যেতে পারে। তবে সনাতন নিয়ম অনুসারে, প্রথমে মন্ত্র পাঠ করে, হলুদ ও দই দিয়ে স্থানটি শুদ্ধ করে সোনার তার দিয়ে ফুটো করার বিধান রয়েছে।
কাদের জন্য এটি করা জরুরি?
১. পাঁচ বছর বয়সের নিচের শিশু, যাদের মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটছে। ২. যাঁরা ইন্টারভিউ বা স্টেজে কথা বলতে ভয় পান বা যাঁদের আত্মবিশ্বাসের অভাব রয়েছে। ৩. ব্যবসায় যাঁরা লাগাতার লোকসানের মুখ দেখছেন, টাকা আটকে যাচ্ছে। ৪. যাঁদের কুণ্ডলীতে রাহুর মহাদশা বা অন্তর্দশা চলছে।
শেষ কথা
কান ফুটো করা মানে কেবলই দুল পরা নয়, এটি আসলে শরীরের একটি বিশেষ এনার্জি পয়েন্টকে সক্রিয় করা। একটা সামান্য সোনার বা রুপোর তার আপনার সন্তানের বা আপনার নিজের ভাগ্য বদলে দিতে পারে।
তবে মনে রাখবেন, কর্মই আসল। শুধু কান ফুটো করে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে ভাগ্য ফিরবে না। পরিশ্রম আপনার, আর আশীর্বাদ বুধের। এছাড়া মেষ বা সিংহ লগ্নের জাতক-জাতিকাদের জন্য সোনা সবসময় শুভ নাও হতে পারে, তাই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার আগে একবার অভিজ্ঞ জ্যোতিষীর পরামর্শ নিয়ে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।