ভোটে হারের পরেও মমতা কি মুখ্যমন্ত্রী থাকতে পারেন? জানুন কী বলছে আইন

বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন মোড়। বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল জনমতের সামনে তৃণমূল সরকারের পতন ঘটেছে, গেরুয়া ঝড়ে উড়ে গিয়েছে ঘাসফুল। কিন্তু ফল প্রকাশের পর সবথেকে বড় চমক দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফা দেবেন না তিনি। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, জনগণের রায়ে হেরে যাওয়ার পর কি আদেও ক্ষমতায় টিকে থাকা সম্ভব? না কি স্রেফ জেদ বজায় রাখতে গিয়ে বড় আইনি বিপদে পড়তে চলেছেন বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী?

সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং আইনজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে ‘সাংবিধানিক সংকট’ হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, ভারতের সংবিধান ও সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মমতার এই অনড় অবস্থান আদেও ধোপে টিকবে না।

রাজ্যপাল কি সরাসরি সরাতে পারেন?

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ আর. কে. সিং অত্যন্ত সরাসরি ভাষায় জানিয়েছেন, যদি মুখ্যমন্ত্রী নিজে ইস্তফা না দেন, তবে রাজ্যপাল তাঁকে সরাসরি বরখাস্ত করার ক্ষমতা রাখেন। তাঁর মতে, বিধানসভার মেয়াদ শেষ হওয়া মানেই ক্ষমতাসীন মুখ্যমন্ত্রী ‘সাংবিধানিকভাবে মৃত’। সংবিধানের কোনও ধারাতেই এমন কোনও নেতার রাজ্য পরিচালনার অধিকার নেই, যিনি নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছেন।

তিনি সংবিধানের চারটি বিশেষ দিকের উল্লেখ করেছেন:

  • অনুচ্ছেদ ১৬৪: মুখ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রীরা রাজ্যপালের সন্তুষ্টির ভিত্তিতে পদে থাকেন। সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে তাঁদের সরে যাওয়া বাধ্যতামূলক।

  • অনুচ্ছেদ ১৬৩: সরকার গঠনের জন্য রাজ্যপাল নিজের বিবেচনাবোধ প্রয়োগ করতে পারেন।

  • অনুচ্ছেদ ১৭২ ও ১৭৪: বিধানসভার মেয়াদ পাঁচ বছর। মেয়াদ শেষে নতুন বিধানসভা গঠন করতে রাজ্যপাল দায়বদ্ধ।

ইস্তফা না দেওয়া কি স্রেফ রাজনৈতিক চাল?

অন্যতম আইন বিশেষজ্ঞ জ্ঞানান্ত সিং মনে করছেন, মমতার এই মন্তব্য আইনি লড়াইয়ের চেয়েও বেশি রাজনৈতিক কৌশল। তিনি ব্যাখ্যা করেন, সংবিধানের ১৬৪ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাজ্যপাল চাইলে তাঁকে পদ থেকে সরিয়ে দিতে পারেন। তবে এক্ষেত্রে একটি সূক্ষ্ম বিষয় রয়েছে—রাজ্যপাল ততক্ষণ পর্যন্ত একজনকে সরিয়ে দেন না, যতক্ষণ না বিকল্প সরকার গঠনের পথ প্রশস্ত হচ্ছে। কারণ সরকার ছাড়া রাজ্য চলতে পারে না।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি পরাজিত হয়েও মুখ্যমন্ত্রী বড় কোনও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেন, তবে রাজ্যপাল ৩৫৬ ধারা বা রাষ্ট্রপতি শাসনের সুপারিশ করতে পারেন। এছাড়া, যেহেতু নতুন বিধানসভার নির্বাচন হয়ে গিয়েছে, তাই পুরনো বিধানসভার ‘আস্থা ভোট’-এর কোনও যৌক্তিকতা এখানে নেই।

এস আর বোমাই মামলার প্রেক্ষাপট

ঐতিহাসিক এস আর বোমাই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছিল, সংখ্যাগরিষ্ঠতার পরীক্ষা হবে বিধানসভার ফ্লোরে। কিন্তু আর. কে. সিং-এর মতে, যদি কোনও সরকার সংবিধানের মূল কাঠামো এবং জনমতকে অস্বীকার করে, তবে রাজ্যপাল হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারেন না। তিনি চাইলে গোটা মন্ত্রিসভাকে বরখাস্ত করে নতুন বিজয়ী দলকে সরকার গঠনের আহ্বান জানাতে পারেন।

সব মিলিয়ে, বাংলায় পরিবর্তনের পর এখন আইনি লড়াই কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই নজর দেশের তাবড় আইনজীবী ও রাজনৈতিক মহলের।