‘এক মুঠো চালের ভান্ডার’ থেকে অবৈতনিক স্কুল, নিজের জমি-দোকান বিক্রি করে কী করে অনাথ শিশুদের ‘স্বপ্নপূরণের কারিগর’ হয়ে উঠলেন বলরামবাবু?

পূর্ব মেদিনীপুরের ভগবানপুর ২ ব্লকের পাঁউশি গ্রামের বলরাম করণ— এই মানুষটির গল্প শুনলে চোখে জল আসতে বাধ্য। গত ৩০ বছর ধরে নিজে ভিক্ষা করে হাজার হাজার অনাথ শিশুর জীবন গড়ে দিয়েছেন তিনি। তাঁর অনাথ আশ্রম থেকে বড় হয়ে ওঠা ছেলেমেয়েরা আজ কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ নার্স, কেউ বা হাইকোর্টের আইনজীবী।
মানবিক পথ চলার শুরু:
বলরামবাবুর এই সংগ্রাম শুরু হয় আজ থেকে প্রায় ৩০ বছর আগে। কাঁথির রাস্তার পাশে আঁস্তাকুড়ে একটি শিশুকে এঁটো খাবার খুঁজতে দেখে তিনি তাকে নিজের বাড়ি নিয়ে আসেন। এরপর রাস্তাঘাটে বা স্টেশনে অনাথ শিশুদের দেখলেই তিনি নিজের বাড়িতে আনতে শুরু করেন।
সংগ্রাম: এক এক করে বাড়িতে অনাথ শিশুর সংখ্যা বাড়তে থাকে। নিজের সংসার সচ্ছল না হওয়া সত্ত্বেও তিনি শিশুদের ভরণপোষণের জন্য নিজের জমি-জায়গা বিক্রি করে দেন এবং শেষমেশ ছোট্ট ওষুধের দোকানটিও বিক্রি করে দেন।
আশ্রম প্রতিষ্ঠা: নিজের জমি ও দোকান বিক্রির টাকায় তিনি অনাথ শিশুদের জন্য একটি ছোট আশ্রম গড়ে তোলেন। কিন্তু খাদ্যের সংস্থান করা কঠিন হয়ে পড়ে।
গ্রামের মানুষের সাহায্যে ‘এক মুঠো চাল’:
খাদ্য সংস্থানের জন্য বলরাম করণ এক অভিনব পথ বেছে নেন। তিনি নিজের গ্রাম পাঁউশিতে বাড়ি বাড়ি চাল সংগ্রহের জন্য একটি ‘ভান্ডার’ রেখে আসেন এবং আবেদন করেন— প্রত্যেক বাড়ির মায়েরা যেন তার অনাথ শিশুদের জন্য এই ভান্ডারে প্রতিদিন এক মুঠো করে চাল দেন।
দীর্ঘ এক দশক ধরে গ্রামের মানুষের এই সাহায্যে অনাথ আশ্রমের শিশুদের অন্নের সংস্থান দূর হয়। বর্তমানে বিভিন্ন মানুষ এবং কোম্পানির সহায়তায় পাঁউশিতে বলরাম করণ গড়ে তুলেছেন অবৈতনিক স্কুল থেকে শুরু করে অনাথ শিশুদের থাকার ঘরবাড়ি।
স্বপ্নপূরণের ফল:
বলরাম করণের আশ্রম থেকে পড়াশোনা করে অনেকেই আজ সমাজে প্রতিষ্ঠিত— কেউ পুলিশ অফিসার, কেউ আইনজীবী, কেউ এম টেক ইঞ্জিনিয়ার, আর অনেক মেয়েই সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে নার্স হিসেবে কর্মরত। সমাজে প্রতিষ্ঠিত হলেও তাঁরা বলরাম করণকে ভোলেননি; সময় পেলেই চলে আসেন তাদের ‘এই বাড়িতে’। বর্তমানে বলরাম-করণের আশ্রমে প্রতিদিন ১ হাজারেরও বেশি অনাথ ছেলেমেয়েরা পড়াশোনার পাশাপাশি থাকা-খাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। এই একটাই মানুষ ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে হাজার হাজার পরিচয়হীন ছেলেমেয়েদের সমাজে পরিচয় গড়ে তুলে দিচ্ছেন।