ভাববাদের বিরুদ্ধে বস্তুবাদ! ‘খুনের হুমকি’র শিকার নিরীশ্বরবাদীরা, কেন মন্দির-মসজিদের রাজনীতির বিরুদ্ধে সরব নাস্তিক মঞ্চ?

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত রোধ করার লক্ষ্যে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (বিএনএস) ২৯৯ ধারায় সংস্থান রয়েছে। কিন্তু এই ধারাকেই ‘বাকস্বাধীনতা বিরোধী’ আখ্যা দিয়ে তা বাতিলের দাবিতে রাজ্যজুড়ে প্রচার চালানোর লক্ষ্য নিয়েছে নাস্তিক মঞ্চ।

নাস্তিকদের যুক্তি—ঈশ্বরে বিশ্বাস না-করার প্রচার বা ভাববাদের বিরুদ্ধে বস্তুবাদের প্রচার চালাতে গেলেই বিভিন্ন ধর্মগুরুদের রোষানলে পড়তে হচ্ছে তাঁদের।

নাস্তিক মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক প্রতাপচন্দ্র দাস বলেন, “আমরা ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না। এটা আমাদের সংবিধান প্রদত্ত অধিকার। ঠিক তেমনই, ঈশ্বরে বিশ্বাস না-করার প্রচার করার অধিকার আমাদের রয়েছে। কিন্তু, তা করতে গেলেই ধর্মের ধ্বজাধারীদের আক্রমণে পড়তে হচ্ছে। বহুবার খুনের হুমকি দেওয়া হয়েছে।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক দলগুলো বর্তমানে ধর্মের সঙ্গে রাজনীতিকে ওতপ্রোতোভাবে জড়িয়ে দিচ্ছে। “মন্দির-মসজিদ-গুরুদুয়ারার রাজনীতি চলছে। ধর্মের রাজনীতি করতে গিয়ে আমাদের টার্গেট করছেন রাজনৈতিক নেতারা,” বলেন তিনি।

রাজ্যজুড়ে সম্মেলন: নিরীশ্বরবাদী ঘোষণার প্রক্রিয়া শুরু

নাস্তিক মঞ্চ জানিয়েছে, তারা প্রাথমিক পর্যায়ে ইতিমধ্যে নদিয়া, উত্তর ২৪ পরগনা ও কলকাতায় সফলভাবে সম্মেলন করেছে। চৈতন্য ভূমি নবদ্বীপেও কয়েক বছর আগে রাজ্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই সম্মেলনগুলিতে বহু ধর্মবিশ্বাসী মানুষের উপস্থিতিও লক্ষ্য করা গিয়েছে, যেখানে ভাববাদের সঙ্গে বস্তুবাদের তফাৎ তুলে ধরা হয়েছে।

সংগঠন এই সম্মেলন ধারাবাহিকভাবে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় করার পরিকল্পনা নিয়েছে। প্রতাপচন্দ্র দাস বলেন, “খুব শীঘ্রই বর্ধমান, মেদিনীপুরে সম্মেলনের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।”

সংগঠনের পরবর্তী লক্ষ্য হলো কোর্ট থেকে এফিডেভিটের মাধ্যমে নাস্তিক ঘোষণা পত্র বা স্বীকারোক্তি গ্রহণ করা।

৫০ জনের বেশি নাস্তিক সদস্য, অধিকাংশই উত্তর ২৪ পরগনার

নদীয়ার নবদ্বীপের বাসিন্দা, বেসরকারি সংস্থার কর্মী প্রতাপচন্দ্র দাসই রাজ্যে নাস্তিক মঞ্চ গড়ে তোলার অন্যতম কারিগর। তাঁর পরিবারের তিন সদস্যই নিরীশ্বরবাদী। তিনি জানান, রাজ্যের প্রায় প্রতিটি জেলাতেই তিনি ১৫-১৭ জনের জেলা কমিটি গঠন করেছেন। কেন্দ্রীয় কমিটিতে রয়েছেন ৯ জন সদস্য।

সংগঠনে নাম নথিভুক্ত করেছেন ৫০০-এর বেশি নাস্তিক। এদের মধ্যে উত্তর ২৪ পরগনার বাসিন্দাই বেশি, এরপর রয়েছে কলকাতা। চলতি নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে উত্তর কলকাতার রামমোহন লাইব্রেরি হলে কলকাতা জেলা সম্মেলনে দু’শো থেকে আড়াইশোর বেশি মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

প্রতাপচন্দ্র দাস বলেন, “সম্মেলন শেষে ৭০-৮০ জন আমাদের থেকে সদস্যপদ গ্রহণের জন্য ফোন নম্বর নিয়েছেন। আমরা আশাবাদী, এইভাবেই এই ধর্মীয় রাজনীতির বিরুদ্ধে মানুষের মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলতে সবাই একত্র হবেন।”

বিএনএস-এর ২৯৯ ধারা কী বলছে?

উল্লেখ্য, ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ২৯৯ ধারায় স্পষ্ট বলা আছে যে, শব্দ, চিহ্ন, ভিডিয়ো বা ছবি ইত্যাদির মাধ্যমে কোনও ধর্ম বা ধর্মীয় বিশ্বাসীকে অবমাননা করা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এই ধারায় দোষী সাব্যস্ত হলে তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার নিদান রয়েছে। নাস্তিক মঞ্চ বৃহত্তর আন্দোলন করে এই ধারা বাতিলের পরিকল্পনা করছে।