হুগলিতে বন্ধ একের পর এক বাস রুট, জেনেনিন ক্রমশ হচ্ছে ‘সমস্যা জটিল’ ?

হুগলি জেলায় ক্রমশ তলানিতে এসে ঠেকেছে বাস পরিষেবা। হু হু করে কমছে বাসের সংখ্যা, বন্ধ হয়েছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রুট। এর ফলে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ যাত্রীরা, যাঁদের দাবি, হাতে অনেকটা বাড়তি সময় নিয়ে বের না হলে গন্তব্যে পৌঁছনো অসম্ভব। একদিকে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, যানজট এবং অন্যদিকে দেদার বেড়ে যাওয়া টোটো-অটোর দাপট— এই দুইয়ের চাপে গণপরিবহণের অন্যতম মাধ্যম বাস পরিষেবা আজ কার্যত ‘কোমায়’

যাত্রীদের অভিযোগ: অসহনীয় অপেক্ষা ও অপ্রতুল পরিষেবা

যাত্রীরা জানাচ্ছেন, বাস এখন বিরক্তির কারণ। জিটি রোডে যেখানে একসময় বহু মানুষ বাসের জন্য অপেক্ষা করতেন, সেই ভিড় এখন কমেছে।

  • সময় নষ্ট: বাসযাত্রী চৈতালি ঘোষের অভিযোগ, “বাস স্ট্যান্ড থেকে বেরোনোর পর স্টপেজে গিয়ে বহুক্ষণ যাত্রীদের জন্য অপেক্ষা করে, এটা আমাদের বিরক্ত লাগে।”
  • ভাড়া বৃদ্ধি সমর্থন: তিনি মনে করেন, পরিষেবা ঠিক থাকলে মানুষ বেশি ভাড়া দিয়েও যেতে রাজি। “পেট্রলের দাম বেড়েছে, তাই একটু ভাড়া বাড়ানো যেতে পারে। তবে সার্ভিস ও রাস্তাঘাট ঠিক হওয়া দরকার।”
  • আর্থিক দিক: আরেক বাসযাত্রী খন্দকার জিগরিয়া মনে করেন, শুধু স্বাচ্ছন্দ্য খুঁজলে হবে না, অর্থনৈতিক বিকাশ না হলে স্বাচ্ছন্দ্য বজায় রাখা কঠিন।

বাস মালিকদের দাবি: আর্থিক ক্ষতি ও রুটে ছেদ

বাস মালিকদের দাবি, যাত্রী অভাব ও চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে বহু রুটের বাসের চাকা চিরতরে থমকে দিতে হয়েছে।

  • পরিমাণ: চুঁচুড়া সদর সাবডিভিশন থেকেই ১৩৮টি লোকাল বাস এবং ১৩টি এক্সপ্রেস বাস বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
  • বন্ধ হওয়া রুটের তালিকা: চুঁচুড়া থেকে কোন্নগর (৫৮টি বাস), চুঁচুড়া থেকে মেমারি (৩৭টি বাস) এবং চুঁচুড়া থেকে কালনা রুটের সবক’টি বাস বন্ধ। এমনকি, চুঁচুড়া থেকে দিঘা, বাঁকুড়া ও বহরমপুরের মতো দূরপাল্লার রুটের বাসও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে।
  • আরামবাগ: আরামবাগ টার্মিনাস থেকে ১৬/২০ রুটে চলাচলকারী বাসগুলিও ২০১৩ সালের পর থেকে বন্ধ।

দীর্ঘ ২০ বছরের মধ্যে অজস্র ছোট গাড়ি, টোটো ও ম্যাজিক গাড়ি রাস্তায় নেমেছে। বাস মালিকরা বলছেন, শর্ট রুটের যাত্রীরা এখন এই ছোট যানবাহনকে ব্যবহার করছেন। একটি বাস টিকে থাকার জন্য যে সংখ্যক যাত্রী প্রয়োজন, তা আর মিলছে না।

পরিবহণ মন্ত্রী ও সাংসদের বক্তব্য

পরিবহণ মন্ত্রী স্নেহাশিস চক্রবর্তী স্বীকার করেছেন যে সমস্যা জটিল। তিনি বলেন, “যাত্রী স্বাচ্ছন্দ্য দিতে গেলে বাসে গাদাগাদি করে যাত্রী তোলা যায় না… কিন্তু যত সংখ্যক যাত্রী নিয়ে বাস চালাতে হবে, সেই যাত্রী সংখ্যার ভাড়া দিয়ে বাস বেঁচে থাকতে পারবে।” যদিও রাজ্য সরকার বাস ভাড়া বাড়াতে রাজি নয়।

  • ভাড়া নিয়ে অভিযোগ: যাত্রীদের অভিযোগ, অনেক জায়গায় সরকার নির্ধারিত ভাড়ার থেকে ৩ থেকে ৭ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে, যদিও বাসের ভাড়ার তালিকা কোথাও টাঙানো থাকে না। পরিবহণ মন্ত্রী জানিয়েছেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
  • সাংসদের উদ্বেগ: বাসের সংখ্যা কমে যাওয়ায় হুগলির সাংসদ রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, “যদি বাসের প্রয়োজন হয়, তা হলে আমি পরিবহণমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলব।”

বাস অ্যাসোসিয়েশনের কড়া বার্তা

শ্রীরামপুর বাস অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক রঞ্জন পরামানিক জানান, একসময় শ্রীরামপুর কোট থেকে ২৫০টি বাস চলত, বর্তমানে চলে মাত্র ৯০টি।

🗣️ তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, “ভাড়া ঠিকঠাক থাকলে বাস বিভিন্ন স্টপেজে গিয়ে দাঁড়াতো না। যাত্রীরা সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছে যেত… এখন কোমায় চলে গিয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে এই শিল্পটাই উঠে যাবে। বাস বাঁচাতে গেলে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে।”