“প্রতারিত ১ লক্ষ, লোপাট ৫০০ কোটি”-ডিজিটাল অ্যারেস্ট ঘিরে হতবাক শীর্ষ কোর্ট

ভুয়ো থানা, নকল আদালত আর জাল বিচারপতি সেজে স্মার্ট ফোনের মাধ্যমে দেশজুড়ে চলা ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ প্রতারণার কারবারে এবার নজিরবিহীন হস্তক্ষেপ করল সুপ্রিম কোর্ট। এই সংগঠিত অপরাধের ধরন দেখে শীর্ষ আদালত শুধু বিস্মিতই নয়, বরং একে বিচার ব্যবস্থার মর্যাদার উপর ‘সরাসরি আঘাত’ বলে মন্তব্য করেছে। একই সঙ্গে এই ঘটনা মোকাবিলায় কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারগুলিকে একসঙ্গে কাজ করার নির্দেশ দিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব-সহ একাধিক কর্তাকে নোটিস পাঠিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৯ সাল থেকে শুরু হওয়া এই সাইবার ক্রাইম ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। শুধুমাত্র চলতি বছরের প্রথম ছ’মাসে দেশে প্রায় ১ লক্ষ মানুষ ‘ডিজিটাল অ্যারেস্টে’র শিকার হয়েছেন এবং প্রতারিতদের খোয়া যাওয়া অঙ্কের পরিমাণ পাঁচশো কোটি টাকারও বেশি। গত বছর এই ধরনের ১.২৩ লক্ষের বেশি অভিযোগে ১,৯৩৫ কোটি টাকা হাতানো হয়েছিল। এই প্রতারণায় বেছে বেছে বয়স্কদের নিশানা করা হচ্ছে, যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দেশের শীর্ষ আদালত।
হরিয়ানার অম্বালার এক বৃদ্ধ দম্পতির অভিযোগের ভিত্তিতে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে এই মামলার শুনানি করছে সুপ্রিম কোর্ট। দম্পতির অভিযোগ, গত ১ থেকে ১৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্টে’র ভয় দেখিয়ে তাঁদের সারা জীবনের সঞ্চয় থেকে প্রায় দেড় কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
প্রতারকরা সিবিআই এবং আইবি আধিকারিক সেজে ওই বৃদ্ধ দম্পতির সঙ্গে ভিডিয়ো কলে যোগাযোগ করে। তাঁদের বিরুদ্ধে গুরুতর তদন্ত চলার কথা বলে সুপ্রিম কোর্টের একটি ভুয়ো নির্দেশনামা দেখানো হয়। এই নির্দেশে প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব খান্নার জাল স্বাক্ষর এবং ভুয়ো স্ট্যাম্পও ব্যবহার করা হয়েছিল। গ্রেপ্তারের এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের ভয় দেখিয়ে দফায় দফায় ব্যাঙ্ক লেনদেনের মাধ্যমে টাকা হাতানো হয়।
বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচির ডিভিশন বেঞ্চ কেন্দ্রকে নোটিস দিতে গিয়ে মন্তব্য করেছে, “সাধারণ ভাবে রাজ্য পুলিশকেই এই ঘটনার তদন্ত করতে বলতাম। কিন্তু আমরা বিস্মিত ও হতবাক। একে সাধারণ ভাবে নেওয়া যাবে না।”
আদালতের পর্যবেক্ষণ: “সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ দেখিয়ে প্রতারণা করা হয়েছে। বিচারপতি, ইডি আধিকারিকের ভুয়ো স্বাক্ষর রয়েছে তাতে। আদালতের বিষয়ে এ রকম ভুয়ো নথি সামনে আসতে থাকলে জনগণের বিশ্বাস এবং ভরসায় আঘাত লাগবে। এটি আমাদের বিচারব্যবস্থার মর্যাদার উপর সরাসরি আঘাত।”
সাইবার বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, এই র্যাকেটগুলি দুবাই, সিঙ্গাপুর, চিন, কম্বোডিয়ার মতো দেশ থেকে চালানো হচ্ছে এবং টাকাও পাচার হয়ে যাচ্ছে বিদেশে।
এই গুরুতর অপরাধের মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব, সিবিআইয়ের ডিরেক্টর এবং হরিয়ানার স্বরাষ্ট্রসচিবকে নোটিস পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে আদালত। পাশাপাশি নাগরিকদের সতর্ক করে দিয়ে শীর্ষ আদালত জানিয়েছে, সরকারি সংস্থা বা আদালত কখনও ফোন বা হোয়াটসঅ্যাপে গ্রেপ্তারি বা সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নোটিস পাঠায় না। এমন বার্তা পেলে তা সাইবার হেল্পলাইন নম্বর ১৯৩০ বা স্থানীয় থানায় জানানোর পরামর্শ দিয়েছে আদালত।