পাহাড় কি তবে প্রেমের শহর? মেঘভাঙা দুর্যোগ সত্ত্বেও মাত্র এক সপ্তাহেই দার্জিলিংয়ে পর্যটকদের ঢল, বুকিং শতভাগ হওয়ার পথে!

মাত্র দু’সপ্তাহ আগে প্রবল প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল দার্জিলিং এবং পার্শ্ববর্তী এলাকা। আবহাওয়া দপ্তর যদিও একে মেঘভাঙা বৃষ্টি নয়, প্রবল নিম্নচাপের প্রভাব বলে জানিয়েছিল, তবে মৃত্যু মিছিল আর হাহাকারে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল পাহাড়ের জীবনযাত্রা। দুর্যোগের পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একাধিকবার এলাকা পরিদর্শন করেছেন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। রাস্তাঘাট, বাসস্থান, অন্নসংস্থান, চাকরি-স্বাস্থ্য ও পর্যটন সচল রাখতে বিশেষ নজর দিয়েছেন তিনি।
আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলা থেকে বর্ষা বিদায় নিয়েছে। আর তার সঙ্গেই পাহাড়ে ফিরেছে সোনাঝরা রোদের আলো। ভ্রমণপিপাসু বাঙালির কাছে দার্জিলিং মানেই এক অদ্ভুত প্রেমের শহর। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ধাক্কা সামলে সাত দিন কাটতে না কাটতেই কাঞ্চনজঙ্ঘার হাসি দেখতে আবারও মানুষের ঢল নামতে শুরু করেছে পাহাড়ে। পর্যটন ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, যেভাবে পর্যটকদের ভিড় বাড়ছে, তাতে আর কয়েক দিনের মধ্যেই টিকিট ও হোটেল বুকিং প্রায় শতভাগ ছাপিয়ে যাবে।
প্রকৃতি যেন ভ্রমণপিপাসুদের সঙ্গ দিয়েছে। দুর্যোগ কাটতেই দার্জিলিংয়ের ম্যাল রোড এখন ঝলমল করছে আশ্বিনের ঝকঝকে রোদে। নীল আকাশে তুলোর মতো মেঘ আর হিমেল হাওয়া মনকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। চৌরাস্তার বেঞ্চে বসে কেউ চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন, কেউ আবার শীত উপেক্ষা করে মেতে উঠেছেন সেলফি সেশনে। কাঞ্চনজঙ্ঘার পটভূমিতে হাসি-আনন্দের মুহূর্ত ক্যামেরা বন্দি করতে ব্যস্ত সকলে।
এক মহিলা পর্যটক হাসতে হাসতে বলেন, “রাস্তার দুরবস্থায় কষ্ট হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখেই সব ভুলে গিয়েছি!” আরেক গৃহবধূ জানান, দুর্যোগের খবর শুনে ভয় পেলেও স্থানীয় হোটেল মালিকের আশ্বাসে তাঁরা তারিখ বদলে চলে এসেছেন। তাঁর কথায়, “এখন দেখে বুঝতে পারছি, ভয় কাটিয়ে পাহাড় আবার জেগে উঠেছে।”
প্রকৃতির রোষে প্রায় দু’সপ্তাহ থমকে গিয়েছিল পাহাড়ের স্বাভাবিক জনজীবন। বালাসন নদীর সেতু ভেঙে যাওয়া, রোহিনী রোড ও মিরিক-দুধিয়া রুটে যানচলাচল বন্ধ থাকার মতো ঘটনা ঘটলেও, পর্যটকদের পদচারণা থামানো যায়নি। ১০ নম্বর জাতীয় সড়কেও জোর কদমে চলছে মেরামতির কাজ।
দার্জিলিংয়ের ম্যাল রোড এখন আবারও সরগরম। মহাকাল মন্দিরে পুজো, চিড়িয়াখানা, রাজভবন, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের বাড়ি—সবখানে চলছে মানুষের আনাগোনা। সন্ধ্যায় হস্তশিল্প, চা ও উলের পোশাকের দোকানে জমে উঠেছে কেনাকাটার উৎসব।
স্থানীয় সূত্রে খবর, দার্জিলিংয়ে প্রায় ১৫০০ হোটেল ও ৫০০ হোমস্টে রয়েছে। ইতিমধ্যেই ৫৫-৫৬ শতাংশ রুম বুকড হয়ে গেছে। পর্যটন ব্যবসায়ীরা আশাবাদী, দীপাবলির আগেই এই হার ৮৫-৯০ শতাংশে পৌঁছবে। দার্জিলিং হোটেল অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক রেজি লামা জানান, “অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই হোটেলগুলিতে রুম পাওয়া মুশকিল। ডিসেম্বর পর্যন্ত এই ভিড় থাকবে বলেই আশা করছি।”
পর্যটকদের এই ঢল যে শুধু দার্জিলিং নয়, গোটা উত্তরবঙ্গের অর্থনীতিকেই নতুন প্রাণ দেবে, তা বলাই বাহুল্য। স্থানীয় প্রশাসনও আশাবাদী যে দ্রুত পরিকাঠামো ঠিক করা গেলে দীপাবলির সপ্তাহে বুকিং শতভাগ ছুঁতে পারে। দুর্যোগের আঁচ পেরিয়ে, ভয় কাটিয়ে দার্জিলিং আজ আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে—হাসিখুশি, ব্যস্ত এবং জীবন্ত।