ব্রাজিল থেকে আসছে তেল কোম্পানি Petrobras, খনি সংস্থা Vale: কেন দিল্লীতে ভারত-ব্রাজিল উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর বাণিজ্য নীতি বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। এর সবচেয়ে বেশি শিকার হয়েছে যে দুটি দেশ, তারা হলো ভারত এবং ব্রাজিল। এবার এই দুটি উদীয়মান অর্থনীতি এক ছাতার নিচে আসছে এবং একসাথে এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
প্রকৃতপক্ষে, আমেরিকা ভারত এবং ব্রাজিলের বেশ কিছু পণ্যের উপর উচ্চহারে শুল্ক (Tariff) আরোপ করেছে, যা উভয় দেশের বাণিজ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই কারণেই ভারত এবং ব্রাজিল আমেরিকান শুল্কের প্রভাব কমাতে নতুন বাজার ও অংশীদারিত্বের সন্ধানে নেমেছে।
এই সপ্তাহে নয়াদিল্লিতে ভারত ও ব্রাজিলের সরকারি কর্মকর্তা এবং শীর্ষ ব্যবসায়িক নেতাদের মধ্যে বৈঠক চলছে। উভয় দেশই তাদের পারস্পরিক বাণিজ্যকে তিনগুণ বাড়িয়ে ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ট্রাম্পের নীতি এভাবেই চলতে থাকলে ভারত ও ব্রাজিলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ১% কমে যেতে পারে। তাই উভয় দেশই এখন একে অপরের সাথে সহযোগিতা করে সেই ক্ষতি থেকে বাঁচার চেষ্টা করছে।
নয়াদিল্লিতে ভারত-ব্রাজিলের নতুন কৌশল তৈরি
নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ব্রাজিলের একটি শক্তিশালী ও বিশেষ প্রতিনিধি দল অংশ নিচ্ছে। এই দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ব্রাজিলের উপ-রাষ্ট্রপতি জেরাল্ডো আলকমিন। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন দেশের কিছু বৃহৎ সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা, যেমন তেল কোম্পানি পেট্রোব্রাস, খনি সংস্থা ভেলে এসএ এবং খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ সংস্থা বিআরএফ এসএ।
এই বৈঠকের মূল লক্ষ্য হলো কৃষি, বায়োফুয়েল (জৈব জ্বালানি) এবং প্রতিরক্ষা (Defence) ক্ষেত্রে ভারতের সাথে একটি শক্তিশালী ও দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা। উভয় দেশের প্রচেষ্টা হলো, তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে কেবল শুল্ক থেকে আত্মরক্ষা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ না রেখে, একসাথে একটি নতুন বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা।
ভারত ও ব্রাজিল ২০০৪ সালের ‘মারকোসুর-ভারত’ বাণিজ্য চুক্তিকে আরও কার্যকর করার বিষয়েও আলোচনা করছে। চুক্তির পরিধি বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা চলছে যাতে ভবিষ্যতে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পথ আরও সহজ হয়।
আমেরিকা থেকে দূরত্ব বাড়াচ্ছেন মোদী ও লুলা
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা-র এই ঘনিষ্ঠতা আজকের পরিবর্তিত বিশ্বের এক বড় গল্প তুলে ধরছে। এর পেছনে প্রধান কারণ হলো আমেরিকার পরিবর্তনশীল এবং কঠোর নীতি।
ট্রাম্পের নেতৃত্বে আমেরিকা পুরনো বাণিজ্য চুক্তি এবং কয়েক দশকের পুরনো বিশ্বাসযোগ্য সম্পর্ককে উপেক্ষা করেছে। এর ফলে বিশ্বের বহু দেশ, বিশেষত উদীয়মান অর্থনীতিগুলি, নতুন কৌশল এবং অংশীদারিত্বের সন্ধানে বাধ্য হচ্ছে। ওয়াশিংটনের পরিচিত পলিসি কনসালটেন্সি ‘আর্কো ইন্টারন্যাশনাল’-এর প্রধান থিয়াগো ডি আরাগাও-এর মতে, ট্রাম্পের ‘ট্রেড ওয়ার’ বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যের সমীকরণ পাল্টে দিয়েছে।
আমেরিকান শুল্কের ফাঁদে ভারত ও ব্রাজিল
ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকেই ভারত ও ব্রাজিলকে বড়সড় বাণিজ্যিক ধাক্কা সামলাতে হয়েছে। আমেরিকার পক্ষ থেকে উভয় দেশের বহু পণ্যের উপর ৫০% পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, যা সরাসরি তাদের রফতানির উপর প্রভাব ফেলেছে।
- ব্রাজিলের উদ্বেগ: ব্রাজিলের মোট রফতানির প্রায় ১২% আমেরিকায় যায়। গরুর মাংস (Beef) এবং ইস্পাতের মতো বড় পণ্যগুলির চাহিদা আমেরিকায় কমলে ব্রাজিলের অর্থনীতিতে বড়সড় ধাক্কা লাগতে পারে।
- ভারতের নাজুক পরিস্থিতি: ভারত আরও নাজুক অবস্থানে রয়েছে, কারণ আমেরিকা তার সবচেয়ে বড় রফতানি বাজার। ভারতের মোট রফতানির প্রায় ২০% এককভাবে আমেরিকায় যায়, যার মধ্যে ইলেকট্রনিক্স, গয়না এবং ওষুধ প্রধান। আমেরিকার শুল্ক সংঘাত ভারতের জন্য তাই বড় উদ্বেগের কারণ।
এই পরিস্থিতিতে ব্রাজিল তাদের কিছু পণ্যের বাজার আমেরিকা থেকে সরিয়ে আর্জেন্টিনা এবং চীনের দিকে নিয়ে গেলেও, ব্রাজিলীয় কর্মকর্তারা মনে করেন যে সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে ভারতের সাথে। তাই শুল্কের এই ঝড় থেকে বেরিয়ে আসার জন্য ব্রাজিল এখন ভারতের সাথে সম্পর্ক গভীর করতে উদ্যোগী হয়েছে।