মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান শক্তি হিসেবে মিশরের প্রত্যাবর্তন: কেন গাজা চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য শরম এল-শেখকে বেছে নেওয়া হল?

আজ অর্থাৎ সোমবার মিশরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে গাজা পিস সামিট। গাজা যুদ্ধবিরতি নিয়ে চুক্তির দলিলে দেশটিতে সই হচ্ছে। আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পও এই সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন। তাঁর সঙ্গে আরও ২০টি দেশের প্রতিনিধি এই সামিটের অংশ হবেন। গাজা যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাতারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এর আগেও কাতারেই যুদ্ধবিরতি নিয়ে বেশ কয়েকটি বৈঠক হয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, যুদ্ধবিরতির মতো এত গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিতে কাতারের বদলে মিশরে কেন সই হচ্ছে?

বর্তমানে মিশর গাজা যুদ্ধে মধ্যস্থতাকারী এবং শান্তির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। মিশরের শরম এল-শেখে ট্রাম্প এবং রাষ্ট্রপতি আল-সিসির নেতৃত্বে এই বৈঠকের উদ্দেশ্য হলো গাজায় যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটানো এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।

গাজা চুক্তিতে মিশরে সই হওয়ার ৪টি মূল কারণ

মিশরে গাজা চুক্তিতে কেন সই হচ্ছে, তা চারটি মূল পয়েন্টের মাধ্যমে বোঝা যেতে পারে:

১. রাফা ক্রসিং (Rafa Crossing) – কৌশলগত গুরুত্ব: রাফা ক্রসিং গাজা এবং ইজরায়েল উভয়ের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি গাজার একমাত্র অ-ইজরায়েলি-নিয়ন্ত্রিত সীমান্ত। গাজা উপত্যকার বেশিরভাগ সীমান্ত ইজরায়েলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যুদ্ধের সময় মানবিক সাহায্য পৌঁছানোর প্রধান রাস্তা হিসেবে রাফা ক্রসিং গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রাফা ক্রসিং ইজরায়েলের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে নেই, এটি একমাত্র স্থলপথ যা মিশরের সঙ্গে যুক্ত। ইজরায়েল যখন গাজাকে অবরোধ করে, তখন বাইরের বিশ্বের সঙ্গে গাজাকে যুক্ত করার একমাত্র পথ থাকে রাফা। রাফা সীমান্ত দিয়েই যুদ্ধকালীন সময়ে ওষুধ, খাদ্য সরবরাহ, জল, জেনারেটর, চিকিৎসা কর্মী এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী ভিতরে পাঠানো হয়েছে। ইজরায়েল সহযোগিতা না করলে গাজায় সাহায্য পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব। রাফা ক্রসিং মিশরের নিয়ন্ত্রণে থাকায়, চুক্তিতে মিশরের ভূমিকা খুব কৌশলগত হয়ে ওঠে।

২. কাতারে ইজরায়েলি হামলা এবং নিরাপত্তার প্রশ্ন: ইজরায়েল কাতারের উপর হামলা চালিয়েছিল। গত ৯ সেপ্টেম্বর দোহায় হামাস নেতাদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায় ইজরায়েল। এই হামলার পর নিরাপত্তার প্রশ্ন ওঠে। যদিও ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু সম্প্রতি হামলার জন্য কাতারের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন, তবুও এই ঘটনা চুক্তির স্থান হিসেবে কাতারের নিরাপত্তা নিয়ে হালকা ফাটল তৈরি করেছে। অন্যদিকে, মিশরের সঙ্গে ইজরায়েলের সম্পর্ক স্থিতিশীল।

৩. মিশর ও ইজরায়েলের স্থিতিশীল সম্পর্ক: যেখানে ইজরায়েলের হামলায় কাতারের সঙ্গে সম্পর্কে সামান্য ফাটল দেখা গেছে, সেখানে মিশর এবং ইজরায়েলের সম্পর্ক স্থিতিশীল। মিশর প্রথম আরব দেশ, যারা ১৯৭৯ সালে ইজরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। উভয় দেশের মধ্যে নিরাপত্তা এবং সীমান্তে বহু বছর ধরে গোপন ও প্রকাশ্যে সহযোগিতা চলে আসছে। মিশরের এই স্থিতিশীল ভূমিকার কারণে আমেরিকা এবং ইজরায়েল মনে করে যে দেশটি শান্তি প্রক্রিয়ায় একটি শক্তিশালী জামিনদার (guarantor) হতে পারে।

৪. আল-সিসি এবং ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক: মিশরের রাষ্ট্রপতি আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে শক্তিশালী রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। আমেরিকার কাছে এই আলোচনার জন্য মিশর একটি নির্ভরযোগ্য হোস্ট। মিশর, আমেরিকা এবং ইজরায়েল উভয়ের সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রাখায় একটি ভারসাম্য তৈরি করতে পারে— যা চুক্তিতে স্বাক্ষরের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

মিশরকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জামিনদার হিসাবে দেখা হচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন মিশরকে গাজায় শান্তি কার্যকর করা এবং ইজরায়েল-প্যালেস্তাইন সংকটে স্থিতিশীলতা আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসাবে গণ্য করছে।