চিকিৎসা বিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত! ক্যানসারের ওষুধ প্রয়োগ করে বিরল স্নায়ুরোগ থেকে প্রাণ বাঁচল ৭ বছরের শিশুর

ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত একটি ওষুধ প্রয়োগ করে বিরল স্নায়ুরোগে (Neurological Disease) আক্রান্ত সাত বছরের এক শিশুর প্রাণ বাঁচিয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত দেখল কলকাতা শহর। কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা এই যুগান্তকারী সাফল্য এনেছেন। ‘সিরো নেগেটিভ অটো-ইমিউন এনসেফালাইটিস’ (Sero-negative Auto-immune Encephalitis) নামক প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত ওই শিশুর উপর ‘রিটুক্সিম্যাব’ (Rituximab) নামের ক্যানসারের ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। শিশুটি বর্তমানে সম্পূর্ণ সুস্থ এবং আজ হাসপাতালেই তার সপ্তম জন্মদিন পালন করা হয়েছে।

কী ঘটেছিল শিশুটির?
ভাটপাড়ার ওই শিশুটি গত ২৮ আগস্ট গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয়। তার ক্রমাগত খিঁচুনির সমস্যা হচ্ছিল, যার ফলে তাকে ভেন্টিলেটর সাপোর্টে রাখতে বাধ্য হন চিকিৎসকরা। প্রাথমিক পরীক্ষায় মেনিনজাইটিস ধরা পড়লেও, সেই চিকিৎসায় অবস্থার কিছুটা উন্নতি হওয়ার পর আচমকাই শিশুটির অবস্থার অবনতি ঘটে। সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে, গোটা শরীর পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয় এবং কথা বলা ও খাওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।

পরবর্তী শারীরিক পরীক্ষার পর পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ারের প্রধান চিকিৎসক সহেলী দাশগুপ্তের নেতৃত্বে মেডিক্যাল টিম শিশুটিকে ‘সিরো নেগেটিভ অটো-ইমিউন এনসেফালাইটিস’ রোগে আক্রান্ত বলে শনাক্ত করে।

‘রিটুক্সিম্যাব’ প্রয়োগে ম্যাজিক
প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতি, যেমন— ‘ইনট্রাভেনাস ইমিউনোগ্লোবিউলিন (IVIG) ও মেথাইলপ্রেডনিসোলোন’ ইনজেকশন প্রয়োগ করেও যখন বিশেষ ফল পাওয়া যায়নি, তখন চিকিৎসকরা ‘রিটুক্সিম্যাব’ ইনজেকশন প্রয়োগের সাহসী সিদ্ধান্ত নেন।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:

রিটুক্সিম্যাব মূলত ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।

স্নায়ু ও অটো-ইমিউন রোগের ক্ষেত্রে এটি কার্যকর প্রমাণিত হলেও, কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গের কোনো হাসপাতালে এই রোগে আক্রান্ত রোগীর ওপর এর আগে এই ওষুধ প্রয়োগ করা হয়নি।

হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, রিটুক্সিম্যাব ইনজেকশন দেওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আশ্চর্যরকম পরিবর্তন দেখা যায়। শিশুটি বসতে, হাঁটতে ও নিজে হাতে খেতে শুরু করে।

চিকিৎসক সহেলী দাশগুপ্ত বলেন, “অটো-ইমিউন রোগের চিকিৎসায় রিটুক্সিম্যাব সত্যিই এক যুগান্তকারী ওষুধ। এই ক্ষেত্রে এটি একেবারে ম্যাজিকের মতো কাজ করেছে।”

শিশুদের নিউরো বিশেষজ্ঞ সার্জন চিকিৎসক অরিজিৎ চট্টোপাধ্যায় বলেন, যখন অন্যান্য প্রথমসারির চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যর্থ হয়, তখন রিটুক্সিম্যাব বি-সেলগুলিকে ধ্বংস করে ক্ষতিকারক অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়া কমিয়ে মস্তিষ্কের স্নায়ুজনিত উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে আনে।

এক মাসের বেশি লড়াই শেষে শিশুটি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। যেহেতু রিটুক্সিম্যাব ইমিউন সিস্টেমকে দুর্বল করে দেয়, তাই কিছুদিন আইসোলেশনে রাখার পর তাকে বের করা হয়েছে। আজ হাসপাতালেই তার জন্মদিন পালিত হয় এবং আগামীকাল, বুধবার তাকে হাসপাতাল থেকে ছুটি দেওয়া হবে।