প্রতীকী স্বীকৃতি নাকি প্রকৃত মুক্তি? প্যালেস্তাইনকে স্বীকৃতি দিয়েই ইজরায়েল বন্ধ করল সেতু, হতাশায় ফুটছে শরণার্থী শিবির!

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। ২১ থেকে ২৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে যুক্তরাজ্য (UK), ফ্রান্স, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, পর্তুগাল, বেলজিয়াম-সহ বহু পশ্চিমী দেশ প্যালেস্তাইন রাষ্ট্রকে (State of Palestine) আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিল। মঙ্গলবার সান মারিনোর ঘোষণার পর জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্য দেশের মধ্যে মোট ১৫৯টি দেশ প্যালেস্তাইনকে স্বীকৃতি জানালো—যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি।

তবে গাজার চলমান রক্তাক্ত বাস্তবতা ও শরণার্থী সংকটের (Refugee Crisis) প্রেক্ষাপটে এই স্বীকৃতি কেবল ‘প্রতীকী পদক্ষেপ’ নাকি ‘প্রকৃত অগ্রগতি’, সেই প্রশ্নই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

প্যালেস্তিনি কর্তৃপক্ষের উল্লাস, তৃণমূলের ক্ষোভ
প্যালেস্তিনি কর্তৃপক্ষ (PA) এই পদক্ষেপকে ‘ঐতিহাসিক’ ও ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বলে স্বাগত জানিয়েছে। রাষ্ট্রপতি মাহমুদ আব্বাস পশ্চিমা দেশগুলিকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন, এটি “ন্যায্য ও স্থায়ী শান্তির পথে অগ্রসর হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।”

অন্যদিকে, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রকের মহাপরিচালক ড. মুনির আল-বুর্শ কটাক্ষ করে বলেন: “একজন রোগী অপারেশন থিয়েটারে রক্তে ভেসে যাচ্ছে, আর ডাক্তার তার আইডি কার্ড যাচাই করছে—এটাই আজকের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ছবি।” গত কয়েক বছরে ইজরায়েলের আগ্রাসনে ৬৫,৫০০-এরও বেশি প্যালেস্তিনি নিহত ও ২০ লাখ মানুষ গৃহহীন হওয়ার পর এই স্বীকৃতিকে তাঁরা প্রতীকী অভিনয় হিসেবেই দেখছেন।

শর্তযুক্ত স্বীকৃতি: হামাসকে বাদ ও ‘নিরস্ত্র’ রাষ্ট্র
পশ্চিমী দেশগুলির এই স্বীকৃতিতে একাধিক কড়া শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রধান হলো: সম্ভাব্য প্যালেস্তাইন রাষ্ট্রকে ‘নিরস্ত্র’ থাকতে হবে এবং হামাসকে (Hamas) বাদ দিতে হবে। প্যালেস্তিনি আন্দোলনের দাবি, দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে মুক্তিসংগ্রাম আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী তাদের স্বীকৃত অধিকার, তাই এই শর্ত আন্তর্জাতিক আইনবিরোধী।

আসল বিতর্ক তৈরি হয়েছে দুটি মৌলিক বিষয় নিয়ে:

শরণার্থীদের ফেরার অধিকার: ১৯৪৮ সালে দেশছাড়া লক্ষ লক্ষ প্যালেস্তিনি ও তাঁদের উত্তরসূরিদের ‘ফিরে আসার অধিকার’-কে এই স্বীকৃতিতে একেবারেই মানা হয়নি। প্যালেস্তিনিদের দাবি, শরণার্থী অধিকার ছাড়া কোনো স্বীকৃতি ন্যায়সঙ্গত হতে পারে না।

বাস্তব নিয়ন্ত্রণ: স্বীকৃতি পাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইজরায়েল কিং হুসেইন সেতু (অ্যালেনবি ব্রিজ) বন্ধ করে দিল, যার ফলে শীর্ষ প্যালেস্তিনি কর্মকর্তারাও আটকে পড়েন। পশ্চিম তীর এখনও ইজরায়েলি বসতি স্থাপন, সামরিক চৌকি ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের অধীনে। প্যালেস্তাইনের নেই কোনো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বা সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের স্বাধীনতা।

ব্রিটেনের দিকে আঙুল: “আমাদের রক্ত দরকার ছিল?”
এই প্রতীকী পদক্ষেপ নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হচ্ছে যুক্তরাজ্য (UK)। ১৯১৭ সালের ব্যালফোর ঘোষণার মাধ্যমে ব্রিটেনই প্যালেস্তাইনে ‘ইহুদি জাতীয় স্বদেশ’ প্রতিষ্ঠার পথ খুলে দিয়েছিল। তাই প্যালেস্তিনিদের মতে, তাদের দীর্ঘ ১০৮ বছরের যন্ত্রণার জন্য ব্রিটেনই সবচেয়ে বড় দায়ী।

কর্মী আমিনা খন্দাকজি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, “তোমরা আগেই বলে দিতে পারতে যে, অন্তত ৬০ হাজার প্যালেস্তিনির রক্ত দরকার হবে তোমাদের সহানুভূতি জাগাতে। আমাদের সেরা তরুণদের হারাতে হবে, তবেই তোমরা প্রতীকী স্বীকৃতি দেবে?”

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ৮০ শতাংশের সমর্থন সত্ত্বেও, যতদিন না ইজরায়েলি দখলদারিত্ব শেষ হচ্ছে, শরণার্থীদের ফেরার অধিকার কার্যকর হচ্ছে এবং প্যালেস্তাইন পূর্ণ সার্বভৌম রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে, ততদিন এই স্বীকৃতি গাজার জনগণের জন্য কোনো বাস্তব স্বস্তি বয়ে আনবে না বলেই মনে করছে তৃণমূল স্তর।