কাদম্বিনী নন, ভারতের প্রথম মহিলা চিকিৎসক ইনি? অভিনন্দন জানিয়েছিলেন রানি ভিক্টোরিয়াও

এটি শুধু একজন নারী চিকিৎসকের গল্প নয়, এটি এক অদম্য জেদ, সমাজের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করার সাহস এবং চরম দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক অবিশ্বাস্য উপাখ্যান। তিনি আনন্দীবাই জোশী, ভারতের প্রথম মহিলা চিকিৎসক। তাঁর জীবন ছিল সংক্ষিপ্ত, মাত্র ২১ বছরের, কিন্তু সেই স্বল্প সময়েই তিনি এমন এক ইতিহাস তৈরি করে গেলেন যা আজও লাখো নারীকে অনুপ্রেরণা জোগায়।

মাত্র ১৪ বছর বয়সে মা হয়েছিলেন আনন্দী। কিন্তু সেই আনন্দ স্থায়ী হয়নি। দশ দিনের মাথায় বিনা চিকিৎসায় তাঁর সন্তানের মৃত্যু হয়। সেই শোক তাঁকে এতটাই বিচলিত করেছিল যে তিনি দাঁতে দাঁত চেপে শপথ নেন, তিনি একজন ডাক্তার হবেন। এরপরই তিনি তাঁর স্বামী গোপালরাও জোশীকে পাশে নিয়ে জীবনযুদ্ধের নতুন অধ্যায় শুরু করেন।

১৮৬৫ সালের ৩১ মার্চ মহারাষ্ট্রের এক জমিদার পরিবারে যমুনা নামে যার জন্ম হয়েছিল, মাত্র ৯ বছর বয়সে তার বিয়ে হয় বিপত্নীক গোপালরাও জোশীর সঙ্গে। গোপালরাও ছিলেন নারীশিক্ষার এক প্রবল সমর্থক। তিনিই যমুনার নাম পরিবর্তন করে রাখেন আনন্দী।

আনন্দী যখন ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখেন, তখন ভারতের রক্ষণশীল সমাজে একজন নারীর ডাক্তার হওয়ার কথা ছিল অকল্পনীয়। গ্রামের মানুষ পুত্রশোকে আনন্দীর মাথা খারাপ হয়ে গেছে বলে মনে করেছিল। কিন্তু স্বামী গোপালরাও স্ত্রীর প্রতিজ্ঞার উপর সম্পূর্ণ আস্থা রেখেছিলেন।

আমেরিকার পথে

ডাক্তারি পড়তে গেলে ইংরেজি শিক্ষা প্রয়োজন। মিশনারি স্কুলে ভর্তি হতে ব্যর্থ হয়ে গোপালরাও আনন্দীকে নিয়ে চলে আসেন কলকাতায়। এরপর ১৮৮০ সালে গোপালরাও আমেরিকান মিশনারি রয়্যাল ওয়াইল্ডারের কাছে সাহায্য চেয়ে চিঠি লেখেন। সেই চিঠি নাকচ হলেও ভাগ্যক্রমে সেটি থিওডিসিয়া কার্পেন্টার নামক একজন আমেরিকান নারীর নজরে আসে, যিনি আনন্দীকে আমেরিকায় ডাক্তারি পড়ার ব্যবস্থা করে দেন।

হিন্দু নারী হয়ে বিদেশ যাবে? এই চিন্তায় গোটা সমাজ বেঁকে বসে। কিন্তু আনন্দী আর গোপালরাও পিছপা হননি। তারা শ্রীরামপুরে একটি বক্তৃতার আয়োজন করেন, যেখানে আনন্দী বোঝান যে ভারতীয় মহিলাদের চিকিৎসার জন্য প্রশিক্ষিত নারী চিকিৎসকের প্রয়োজন কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

ইতিহাস সৃষ্টি

এরপরের গল্প যেন এক রূপকথা। আমেরিকায় থিওডিসিয়া কার্পেন্টারের সহায়তায় আনন্দী পেনসিলভেনিয়ার উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন। কঠোর পরিশ্রমের পর, ১৮৮৬ সালে তিনি এমডি ডিগ্রি অর্জন করে ভারতের প্রথম মহিলা চিকিৎসক হিসেবে ইতিহাসে নাম লেখান। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ‘Obstetrics among the Aryan Hindus’। তাঁর এই সাফল্যে মুগ্ধ হয়ে রাণী ভিক্টোরিয়াও অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়েছিলেন।

উল্লেখ্য, একই বছর জুলাই মাসে কলকাতার এক মেয়ে, কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়, দেশের দ্বিতীয় মহিলা ডাক্তার হিসেবে স্বীকৃতি পান।

অসমাপ্ত যাত্রা

দেশে ফিরে আনন্দী কোলাপুরের অ্যালবার্ট এডওয়ার্ড হাসপাতালের মহিলা ওয়ার্ডের প্রধান চিকিৎসক হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু প্রবাসে থাকার সময় প্রতিকূল আবহাওয়া এবং খাদ্যাভ্যাস তার শরীরকে ভেঙে দিয়েছিল। তিনি যক্ষায় আক্রান্ত হন। ১৮৮৭ সালে, মাত্র ২১ বছর বয়সে এই অদম্য নারী চলে যান।

আনন্দীবাই জোশী ভারতের প্রথম নারী চিকিৎসক হিসেবে ইতিহাসে অমর। তার জীবন নিয়ে মারাঠি ভাষায় জীবনী লেখা হয়েছে, তৈরি হয়েছে উপন্যাস এবং চলচ্চিত্রও। তবে, এই সাহসী এবং প্রতিভাবান নারীর জীবন নিয়ে আজও অনেক তথ্য অপ্রকাশিত রয়ে গেছে।