বিপ্লবী সাম্যময় থেকে হাসির রাজা ভানু, এক কিংবদন্তী অভিনেতার অজানা কাহিনি

বাঙালি দর্শকদের হাসির রাজ্যে যিনি আজও সম্রাট হয়ে রয়েছেন, সেই কিংবদন্তী অভিনেতা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়-এর জীবন ছিল নাটকীয়তায় ভরা। তাঁর আসল নাম ছিল সাম্যময় বন্দ্যোপাধ্যায়, এবং তিনি মজা করে বলতেন, “ছিলাম বাঁড়ুজ্জে, হয়ে গেলাম ভাঁড়ুজ্জে!” তবে মজার ছলে বলা এই কথাগুলোর আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বিপ্লবী জীবনের গভীর গল্প, যা অনেকের কাছেই অজানা।
সিনেমা জগতে আসার কোনো পরিকল্পনা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছিল না। বরং তাঁর আদর্শ ছিলেন চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের অন্যতম নায়ক অনন্ত সিং। তিনি বিপ্লবী দিনেশ গুপ্তকে গুরু মানতেন এবং স্বদেশী আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ছাত্রজীবনে বিজ্ঞানী সত্যেন বসু, ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদার এবং কবি জসীমউদ্দিনের প্রিয়পাত্র ছিলেন তিনি। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি একের পর এক দুঃসাহসিক বিপ্লবী কার্যকলাপে অংশ নিতেন। ব্রিটিশ পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে নিষিদ্ধ বই এবং রিভলভার পাচার করা ছিল তাঁর কাছে জলভাত।
একবার এমনই এক ঘটনা তাঁর জীবন সম্পূর্ণ বদলে দেয়। ব্রিটিশ পুলিশের চোখে পড়ার পর তাঁর নামে ‘দেখলেই গুলি করো’ নির্দেশ জারি করা হয়। এর ফলে তাঁকে নিজের প্রিয় ঢাকা এবং পরিবার ছেড়ে রাতের অন্ধকারে কলকাতায় পালিয়ে আসতে হয়। সেই রাতে বন্ধুর গাড়ির ব্যাকসিটের নিচে লুকিয়ে তিনি ঢাকা থেকে কলকাতায় এসেছিলেন। এই নাটকীয় ঘটনাই তাঁকে এপার বাংলায় নিয়ে আসে, যেখানে তিনি অভিনয় জীবন শুরু করেন।
যে মানুষটি সিনেমায় এসে তাঁর অসামান্য কমেডির মাধ্যমে দর্শকদের হাসির বন্যায় ভাসিয়েছেন, যাঁর “মাসিমা মালপো খামু” সংলাপ আজও জনপ্রিয়, সেই মানুষটির জীবন যে কতটা লড়াকু এবং দেশপ্রেমের আগুনে গড়া, তা ভাবলে অবাক হতে হয়। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’-এর “আমার এই যৌবন” গান থেকে ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’-এর “হাম হাম গুড়ি গুড়ি” নাচ – ভানুর প্রতিটি চরিত্রই দর্শকদের মনে গেঁথে আছে। কিন্তু একজন অভিনেতা হওয়ার আগে তাঁর ধ্যান-জ্ঞান সবই ছিল দেশ এবং দেশের মানুষের স্বাধীনতার জন্য। তাঁর এই বিপ্লবী অতীত সিনেমার পর্দার ভানুকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে।