বাঁকুড়ায় অনাহারে মৃত্যুর অভিযোগ, আধার কার্ড না থাকায় সরকারি পরিষেবা থেকে বঞ্চিত পরিবার!

পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া এক নম্বর ব্লকের কুমিদ্যা গ্রামে বৈদ্যনাথ দাস মোদক (৬৫) নামের এক বৃদ্ধের মৃত্যুর ঘটনায় অনাহারের অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র চাপানউতোর শুরু হয়েছে। মৃতের স্ত্রী কল্পনার দাবি, দীর্ঘদিন ধরে অনাহারে থাকার কারণেই তাঁর স্বামীর মৃত্যু হয়েছে, এবং আধার কার্ড না থাকায় তাঁরা বার্ধক্য ভাতা, লক্ষ্মীর ভান্ডার সহ কোনো সরকারি পরিষেবা পাননি।
স্থানীয় সূত্রে খবর, কুমিদ্যা গ্রামের বাসিন্দা বৈদ্যনাথ দাস একসময় একটি মিষ্টির দোকানে কাজ করতেন। কিন্তু গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কারণে তিনি আর কাজ করতে পারছিলেন না। এরপর থেকেই পরিবারে চরম আর্থিক সংকট দেখা দেয়। পরিবারে দাবি, বৈদ্যনাথ ও তাঁর স্ত্রী কল্পনা, কারওরই আধার কার্ড না থাকায় তাঁদের রেশন কার্ডের সঙ্গে আধার নম্বর সংযোগ করা যায়নি, ফলে রেশনের বরাদ্দও বন্ধ হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে একমাত্র পরিযায়ী শ্রমিক পুত্র সোমনাথ দাস মোদকের সামান্য আয়ের উপরই নির্ভরশীল ছিলেন তাঁরা। সোমনাথের আয়ে নিজের সংসার চালানোই কঠিন ছিল, বাবা-মাকে সাহায্য করার সামর্থ্য তাঁর ছিল না। ফলে বৈদ্যনাথ ও কল্পনার ভাগ্যে কোনোদিন খাবার জুটতো, আবার কোনোদিন তাও জুটতো না। প্রতিবেশীরা মাঝেমধ্যে সাহায্য করলেও তা পর্যাপ্ত ছিল না।
শুক্রবার বৈদ্যনাথ দাস মোদকের বাড়িতেই মৃত্যু হয়। স্থানীয় এবং পরিবারের দাবি, অনাহারেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। স্বামীহারা স্ত্রী কল্পনা ও ছেলে সোমনাথের অভিযোগ, বারবার সরকারি শিবিরে গিয়ে এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে ছুটে গিয়েও আধার কার্ড করাতে পারেননি তাঁরা। আর এর জেরেই তাঁরা সমস্ত ভাতা এবং রেশন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। সোমনাথ দাস মোদক বলেন, “বাবা খেতে পেত না। আমিও খেতে দিতে পারতাম না। বহুবার জানিয়েছি আধার কার্ড নেই। ওরা (স্থানীয় প্রশাসন) কথা শোনে না।” মৃতের স্ত্রী আরও বলেন, “আমার স্বামী খেতে পেতেন না। না কাজ করলে খেতে পাবে কী করে? ছেলে বৌও খেতে দেয় না। আজ সকাল থেকে তেমন কিছু খাইনি। আমাদের যেহেতু আধার কার্ড হয়নি। সেই কারণে রেশনও পেতাম না।”
যদিও, রাজ্যের শাসক দলের জনপ্রতিনিধিরা এই অভিযোগ মানতে নারাজ। বৃদ্ধের মৃত্যুর অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে তাঁদের দাবি, ওই পরিবার আধার কার্ড করানোর ব্যাপারে অনিচ্ছুক ছিলেন এবং বারবার বলা সত্ত্বেও তাঁরা আগ্রহ দেখাননি। বাঁকুড়া ১ নম্বর পঞ্চয়েত সমিতির অংশুমান বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “বয়স জনিত কারণে মৃত্যু। রেশন কার্ড ছিল। এর আগে ওরা বাড়িও পেয়েছে। তবে কেন্দ্রের ভ্রান্ত নীতি আধার লিঙ্ক বাধ্যতামূলক। সেই কারণে এমন অবস্থা। ওরা আধার লিঙ্ক করতে পারেনি।”
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যের শাসক দলকে কাঠগড়ায় তুলেছে বিজেপি। বিজেপি বিধায়ক নীলাদ্রি শেখর দানা বলেন, “আমার চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে যায়। আমি ইচ্ছাকৃত ভাবে এই সরকারকে দুষি না। সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যই এই জায়গায় বারবার যাই। আমি ওখানে গিয়ে কত খাবার দিয়ে এসেছিলাম। আমার কর্মীদের আমি বারেবারে বলি ওদের দেখতে। ওখানকার পঞ্চায়েত কী করছে?” বিজেপির দাবি, তৃণমূলের নেতা ও জনপ্রতিনিধিরা সরকারি প্রকল্পের কাটমানি আর দুর্নীতি নিয়ে এতটাই ব্যস্ত যে সাধারণ মানুষের ন্যূনতম পরিষেবা নিয়ে তাঁদের কোনো মাথা ব্যথাই নেই, তাই এমন ঘটনা দেখতে হচ্ছে।