মিড-ডে মিলে নতুন দিগন্ত, সুন্দরবনের কনকনগর সৃষ্টিধর ইনস্টিটিউশনের জৈব উদ্যোগ

মিড-ডে মিলের গুণগত মান নিয়ে যখন রাজ্যজুড়ে প্রায়শই বিতর্ক ও অপ্রীতিকর ঘটনার খবর সামনে আসে, ঠিক তখনই এক ব্যতিক্রমী এবং অনুপ্রেরণামূলক ছবি উঠে এসেছে উত্তর ২৪ পরগনার সুন্দরবন থেকে। এখানকার কনকনগর সৃষ্টিধর ইনস্টিটিউশন শুধু পড়াশোনা নয়, মিড-ডে মিলের জোগান তৈরি করেও এক নতুন দিশা দেখাচ্ছে। স্কুলের নিজস্ব জমিতে সম্পূর্ণ জৈব পদ্ধতিতে সবজি ও মাছ চাষ করে, সেই টাটকা produce দিয়েই প্রতিদিন মিড-ডে মিল তৈরি হচ্ছে, যা রীতিমতো চমক সৃষ্টি করেছে।

১৯৪৩ সালে স্থাপিত এবং ১৯৪৮ সালে সরকারি অনুমোদনপ্রাপ্ত এই শিশুমিত্র পুরস্কার প্রাপ্ত বিদ্যালয়টি হিঙ্গলগঞ্জ ব্লকের সান্ডেলেরবিল গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় অবস্থিত। উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের এই স্কুলে বর্তমানে প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। পঠন-পাঠনের পাশাপাশি পড়ুয়াদের সামগ্রিক গুণগত মান উন্নয়নেও এই স্কুল সমানভাবে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। আর তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো তাদের এই অভিনব মিড-ডে মিল মডেল।

নিজস্ব খামার থেকে টাটকা খাবার: স্বাস্থ্য আর শিক্ষার মেলবন্ধন
স্কুলের প্রায় দুই বিঘা জমির ওপর গড়ে উঠেছে এক বিশাল সবজি বাগান এবং সংলগ্ন পুকুরে চলছে মাছ চাষ। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই সবজি ও মাছ চাষে কোনো ধরনের কীটনাশক বা রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয় না, সম্পূর্ণ জৈব পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। এই টাটকা এবং স্বাস্থ্যসম্মত সবজি ও মাছই প্রতিদিন মিড-ডে মিলের মেনুতে ব্যবহৃত হচ্ছে। এমন পুষ্টিকর খাবার পেয়ে খুশি পড়ুয়ারা, যার ফলস্বরূপ স্কুলে তাদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো বেড়েছে।

শুধুই সবজি ও মাছ চাষ নয়, স্কুলের ফাঁকা জমিতে রোপণ করা হয়েছে আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, নারকেল, পেয়ারা ও সবেদা-সহ বহু ফলের গাছ। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পড়ুয়ারাই এই সবজি ও মাছ চাষের পরিচর্যা করে। এমনকি, স্কুলের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজেও তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ লক্ষ্যণীয়।

অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী শবনম জমাদার উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে, “আমাদের স্কুলে অর্গানিক কিচেন গার্ডেন আছে। এখানে কোনো কীটনাশক বা রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয় না। সম্পূর্ণ জৈব সার দিয়েই শাকসবজি আর মাছ তৈরি হয়, যা দিয়ে মিড-ডে মিল রান্না করা হয়। এটা শুধু প্রধান শিক্ষকের প্রচেষ্টাতেই সম্ভব হয়েছে।” নবম শ্রেণির ছাত্রী দেবপ্রিয়া বাইনও একই সুর তুলে ধরে, “বাজারে যেসব সবজি বিক্রি হয়, তাতে প্রচুর কীটনাশক থাকে। কিন্তু আমাদের এখানে সব জৈব পদ্ধতিতে হয়। এই কাজে আমরাও সাহায্য করি। এমন একটা স্কুল পেয়ে আমরা খুব খুশি।”

সৌহার্দ্যের পরিবেশ এবং শৃঙ্খলা: ইকো-ফ্রেন্ডলি ডাইনিং হল
কনকনগর সৃষ্টিধর ইনস্টিটিউশন শুধু খাবার সরবরাহেই নয়, সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতেও নজর দিয়েছে। স্কুলে একটি ইকো-ফ্রেন্ডলি মিড-ডে মিল ডাইনিং হল তৈরি হয়েছে, যেখানে সমস্ত ছাত্রছাত্রী একসঙ্গে বসে খাবার খায়। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, পড়ুয়ারা নিজেরাই নিজেদের থালা ধুয়ে তারপর সারিবদ্ধভাবে খেতে বসে। এই শৃঙ্খলা ও আত্মনির্ভরতার শিক্ষা অন্যদের কাছেও অনুকরণীয় হয়ে উঠেছে।

মিড-ডে মিলের রাঁধুনি আরতি মণ্ডল বলেন, “বাজারের শাকসবজির দাম এখন অনেক বেশি। তাই স্কুলের নিজস্ব উৎপাদিত সবজি আর মাছ দিয়েই এখানে রান্না হয়। একদিকে যেমন টাটকা জিনিস দিয়ে রান্না ভালো হচ্ছে, অন্যদিকে সেই খাবার খেয়ে পড়ুয়াদের শরীর-স্বাস্থ্যও ভালো থাকছে। পড়ুয়াদের পাতে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার তুলে দিতে পেরে আমরাও আনন্দিত।”

স্কুলের প্রধান শিক্ষক পুলক রায়চৌধুরী এই উদ্যোগের পেছনের ভাবনা ব্যাখ্যা করে বলেন, “মিড-ডে মিল শুধু খাবার নয়, এর সঙ্গে পড়ুয়াদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার বিষয় জড়িত। এটি এতটাই সংবেদনশীল যে পড়ুয়ারা যে খাবার পাচ্ছে, তা যেমন স্বাস্থ্যসম্মত হতে হবে, তেমনই তার গুণগত মানও ঠিক রাখতে হবে। বাজার থেকে সবজি কিনতে গেলে অনেক টাকা লাগে। তাই শিক্ষকরা সবাই মিলে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলাম যে, স্কুলের অব্যবহৃত জমিতে সবজি চাষ করে তা মিড-ডে মিলের রান্নায় ব্যবহার করা হবে। আমাদের পুকুরেও মাছ চাষ হয়, যা দিয়ে আমরা বছরে চার-পাঁচবার পড়ুয়াদের মাছ খেতে দিই। যেখানে মিড-ডে মিল নিয়ে এত বিতর্ক, সেখানে আমরা হাসিমুখে এই কাজ পরিচালনা করি। আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো স্বাস্থ্যসম্মত খাবার তুলে দিয়ে পড়ুয়াদের বুদ্ধি ও মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটানো। এই কাজে আমরা অনেকটাই সফল হয়েছি।”

কনকনগর সৃষ্টিধর ইনস্টিটিউশনের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সারা রাজ্যের জন্য এক মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে, যেখানে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবেশ-বান্ধব জীবনযাত্রার এক সুন্দর মেলবন্ধন ঘটেছে।