কৃষকদের জন্য সুবর্ণ সুযোগ! ভারত-যুক্তরাজ্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, কৃষি ও মৎস্য খাতে নতুন দিগন্ত

ভারত ও যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক এক নতুন দিগন্তে প্রবেশ করতে চলেছে। আজ, বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দু’দিনের ইংল্যান্ড সফরের সময় ঐতিহাসিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) স্বাক্ষরিত হতে চলেছে। এই চুক্তি ভারতের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য এক ঐতিহাসিক মোড় ঘুরিয়ে দেবে বলে মনে করা হচ্ছে। এর ফলে ভারতীয় কৃষিপণ্য এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্য সামগ্রী যুক্তরাজ্যে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে, যা দেশের রপ্তানিতে এক অভূতপূর্ব গতি আনবে।
কৃষকদের কেন্দ্রে রেখে পরিকল্পনা
ভারতের মোট জনসংখ্যার ৫৫ শতাংশেরও বেশি মানুষ কৃষিনির্ভর। তাই এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রসারিত করবে না, বরং দেশের ছোট ও প্রান্তিক কৃষকদের জীবনেও তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। এই চুক্তির মাধ্যমে কৃষিক্ষেত্রে ‘ভলিউম’ থেকে ‘ভ্যালু’ অর্থাৎ পরিমাণ থেকে মানের দিকে যাত্রা শুরু হবে।
কৃষকদের জন্য চুক্তির সুবিধা
এই চুক্তির ফলে ভারতীয় কৃষকরা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা পাবেন:
শুল্কমুক্ত রপ্তানি: হলুদ, গোলমরিচ, এলাচ, আমের পিউরি, আচার, ডাল এবং অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত খাবার যুক্তরাজ্যে শুল্কমুক্ত রপ্তানির সুযোগ পাবে। এর ফলে রপ্তানিকারকদের মুনাফা বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের প্রতিযোগিতা ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
৯৫% খাদ্য পণ্যে শূন্য শুল্ক: ফল, সবজি, সিরিয়াল, মিশ্র মশলা, প্যাকেটজাত খাবার এবং রেডি-টু-ইট খাবারসহ ৯৫ শতাংশ পণ্যে কোনো শুল্ক থাকবে না। এর ফলে যুক্তরাজ্যে এই পণ্যগুলির দাম কমবে এবং ভারতীয় পণ্য সহজেই সুপারমার্কেট ও অন্যান্য দোকানে প্রবেশ করতে পারবে।
সংবেদনশীল পণ্যে সুরক্ষা: দেশের কৃষকদের স্বার্থরক্ষার জন্য দুধজাত পণ্য, আপেল, ওটস এবং ভোজ্য তেল—এই চারটি ক্ষেত্রে কোনো শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়নি।
২০% রপ্তানি বৃদ্ধি: এই চুক্তির ফলে আগামী তিন বছরে কৃষি রপ্তানি ২০ শতাংশেরও বেশি বাড়তে পারে। ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলার কৃষি রপ্তানির লক্ষ্য অর্জনে এটি একটি বড় পদক্ষেপ।
নীল অর্থনীতির উত্থান
এই চুক্তি থেকে বিশেষভাবে লাভবান হবেন অন্ধ্রপ্রদেশ, ওড়িশা, কেরল এবং তামিলনাড়ুর মৎস্যজীবীরা। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের ৫.৪ বিলিয়ন ডলারের মৎস্য আমদানি বাজারে ভারতের অংশ মাত্র ২.২৫%। এখন থেকে চিংড়ি, টুনা, ফিশমিল-এর মতো পণ্য সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত হবে, যা রপ্তানির সম্ভাবনা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেবে।
অন্যান্য লাভজনক খাত
কফি ও ইনস্ট্যান্ট কফি: এই চুক্তির ফলে যুক্তরাজ্যে ভারতের কফি শেয়ার ১.৭% থেকে আরও বৃদ্ধি পাবে।
চা ও মসলা: যুক্তরাজ্য ভারতের চায়ের ৫.৬% এবং মশলার ২.৯% আমদানি করে। শুল্কমুক্ত প্রবেশের কারণে এই সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাবে।
জিআই ট্যাগ যুক্ত পানীয়: গোয়ার ফেনি, নাসিকের ওয়াইন এবং কেরালার টোডি-র মতো জিআই ট্যাগ যুক্ত পানীয় এখন যুক্তরাজ্যের বাজারে প্রিমিয়াম পণ্য হিসেবে জায়গা করে নেবে।
এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি শুধু একটি সাধারণ চুক্তি নয়, এটি ভারতের কৃষিক্ষেত্রে এক নতুন বিপ্লবের সূচনা। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষক থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বাজারের রপ্তানিকারক—সবাই এই সুযোগে উপকৃত হবেন। ভারত এখন শুধুমাত্র কাঁচা মালের দেশ নয়, বরং একটি ‘ভ্যালু-অ্যাডেড ফুড পাওয়ারহাউস’ হিসেবে বিশ্ব মঞ্চে উঠে আসতে প্রস্তুত।