১০ বছরে ১২ লক্ষ কোটির ঋণ মকুব রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির, কেন এই ঋণ মুকুব? উঠছে প্রশ্ন

গত এক দশকে কেন্দ্রের অধীনে থাকা সরকারি ব্যাঙ্কগুলি কত টাকা ঋণ মকুব করেছে? এই প্রশ্ন ঘিরে ফের তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে সংসদে। রাজ্যসভার তৃণমূল সাংসদ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের লিখিত প্রশ্নের উত্তরে কেন্দ্রীয় অর্থ প্রতিমন্ত্রী পঙ্কজ চৌধুরী এক চমকপ্রদ তথ্য প্রকাশ করেন।
বিপুল অঙ্কের ঋণ ‘মাফ’!
অর্থ প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবর্ষ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষ পর্যন্ত সরকারি ব্যাঙ্কগুলি মোট ১২,০৮,৮২৮ কোটি টাকা ঋণ মকুব করেছে। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার তথ্যের ভিত্তিতেই এই পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে সংসদে।
কেন এই ঋণ মকুব?
মন্ত্রী জানিয়েছেন, এই ঋণ মকুব আসলে অনাদায়ী ঋণ বা নন-পারফর্মিং অ্যাসেট (NPA)-এর হিসেব থেকে বাদ দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া। এটিকে বলা হয় ‘রাইট-অফ’। তবে এর মানে এই নয় যে, ঋণগ্রহীতার দায় শেষ হয়ে গিয়েছে। মন্ত্রী জানান, ঋণগ্রহীতারা এখনও সেই টাকা পরিশোধের দায়ে রয়েছেন এবং ব্যাঙ্কগুলি আইনি পথে সেই অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
ব্যাঙ্কের ব্যালেন্স শিটে ‘সাজানো হিসেব’?
আর্থিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এই ধরনের ঋণ মকুব আসলে ব্যাঙ্কের হিসেব বইকে সুস্থ-স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা। NPA-এর পরিমাণ কম দেখালে ব্যাঙ্কের আর্থিক স্বাস্থ্য তুলনামূলক ভাল দেখায়, যার ফলে বাজারে তাদের ভাবমূর্তিও রক্ষা পায়। তবে এই প্রক্রিয়া আর্থিক স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দেয়।
ঋতব্রতের প্রশ্নে স্বচ্ছতা দাবি
তৃণমূল সাংসদ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রের কাছে আরও জানতে চান, গত পাঁচ বছরে কোন ব্যাঙ্ক কত টাকা ঋণ মকুব করেছে, এবং এই ঋণ মকুবের নেপথ্যে যুক্তিগুলি কী ছিল? তিনি বলেন, “সাধারণ মানুষের করের টাকায় চলে এই ব্যাঙ্কগুলি। সেই অর্থে তাদের আর্থিক নীতিতে স্বচ্ছতা থাকা উচিত।”
সমালোচনার মুখে কেন্দ্র
এই বিপুল অঙ্কের ঋণ মকুবের তথ্য সামনে আসতেই কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির সমালোচনায় মুখর হয়েছে বিরোধীরা। অনেকেই বলছেন, যাঁরা কৃষিঋণের জন্য ছোট অঙ্কের টাকা মেটাতে না পেরে আত্মঘাতী হন, তাঁদের ঋণ মকুব করা হয় না—কিন্তু কর্পোরেট সংস্থাগুলির লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা সহজেই মাফ হয়ে যায়!
এখন নজর ভবিষ্যতের পদক্ষেপে
সরকার জানিয়েছে, ঋণ মকুব মানে ঋণ মওকুফ নয়। তবে এই বিপুল অঙ্কের ঋণ কীভাবে এবং কাদের দেওয়া হয়েছিল, আর সেই টাকা কী আদৌ ফেরত আসবে, তা নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।
জনগণের টাকা নিয়ে ব্যাঙ্ক ও সরকারের এই আচরণ আদৌ গ্রহণযোগ্য কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই থাকবে। এখন দেখার, সরকার ভবিষ্যতে আরও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার দিকে এগোয় কি না।