“গুহার ভিতর গোপন জীবন” – টানা ৮ বছর ধরে সাপের সঙ্গে গুহার মধ্যে যা করছিলেন এই মহিলা ?

কর্নাটকের উত্তর কন্নড় জেলার গোকর্ণের এক প্রত্যন্ত গুহায় রাশিয়ান নারী নিনা কুটিনা এবং তার দুই মেয়ের ৮ বছরের গোপন জীবনের কাহিনি সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসতেই অবাক হচ্ছেন সকলে। ২০১৭ সালে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া সত্ত্বেও ভারত ছেড়ে যাননি নিনা; বরং বেছে নিয়েছিলেন বনের নিভৃত আশ্রয়। গোকর্ণ পুলিশ সম্প্রতি কুমতা তালুকের রামতীর্থ পাহাড়ের একটি দুর্গম গুহা থেকে তাদের খুঁজে বের করেছে। এই ঘটনার পর নিনা এবং তার মেয়েদের রাশিয়ায় ফেরত পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে, তবে নিনা স্পষ্ট জানিয়েছেন, তিনি ভারতের অরণ্য এবং এখানকার আধ্যাত্মিক পরিবেশের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট, এবং এই দেশ ছাড়ার চিন্তায় তিনি দিশেহারা হয়ে পড়ছেন। এমনকি, তিনি সাপেদের সঙ্গে বন্ধুত্বও করেছেন বলে দাবি করেছেন!

কীভাবে এই রহস্যের উন্মোচন?

গত শুক্রবার রামতীর্থ পাহাড়ে নিয়মিত টহল দেওয়ার সময় গোকর্ণ পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর শ্রীধর এসআর এবং তার দল নীনা ও তার মেয়েদের সন্ধান পান। এই এলাকাটি ভূমিধসের জন্য বিপজ্জনক হিসাবে চিহ্নিত। টহল দেওয়ার সময় পুলিশ গুহার দিকে যাওয়া পায়ের ছাপ দেখতে পান। পায়ের ছাপ অনুসরণ করে গুহার কাছে পৌঁছে তারা প্রবেশপথে প্লাস্টিকের ছাউনি এবং দেব-দেবীর ছবি দেখতে পান। ভেতরে ঢুকে তারা এক রুশ নারী এবং তার দুই মেয়েকে দেখতে পান।

সাব-ইন্সপেক্টর শ্রীধর জানান, “নীনা এবং তার মেয়েরা গত দুই মাস ধরে এই গুহায় বসবাস করছিল। এটি ছিল তাদের ৮ বছরের গোপন জীবনের একটি অংশ।” ভূমিধসের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে পুলিশ তাদের গুহা থেকে বের করে আনে।

সাপের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও বন্য জীবন:

নিনা পুলিশকে জানান, সাপগুলি তার বন্ধু এবং তারা কখনও তার কোনও ক্ষতি করে না। তিনি বলেন, “আমরা কাছের জলপ্রপাতে স্নান করতে যেতাম, সেখানে সাপ আমাদের আশেপাশে থাকত, কিন্তু কখনও আক্রমণ করত না।” এই কথা শুনে পুলিশও হতবাক। নিনা তার মেয়েদের নিয়ে বন্য পরিবেশে সম্পূর্ণ মানিয়ে নিয়েছিলেন।

ভারতে আগমন ও লুকিয়ে থাকার কারণ:

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নিনা ২০১৬ সালে ব্যবসায়িক ভিসায় ভারতে এসেছিলেন এবং গোয়া ও গোকর্ণে পর্যটন ও রেস্তোরাঁ খাতে কাজ শুরু করেন। কিন্তু ২০১৭ সালের ১৭ এপ্রিল তার ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও তিনি ভারত ছেড়ে যাননি। ২০১৮ সালে, তিনি একটি বহির্গমন পারমিট নিয়ে নেপালে যান, কিন্তু তারপর ভারতে ফিরে এসে কর্নাটকের উপকূলীয় বনে লুকিয়ে থাকতে শুরু করেন।

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, শ্রীধর বলেন, “নীনা বনে ধ্যান ও পূজা করতে ভালোবাসতেন। তিনি ভয় পেতেন যে হোটেলে থাকলে তার পরিচয় প্রকাশ পাবে, তাই তিনি বনকেই নিজের বাড়ি করে নিয়েছিলেন।”

অজানা বাবা এবং গুহার দৈনন্দিন জীবন:

নীনার দুই মেয়ের জন্ম ভারতেই, কিন্তু নিনা সন্তানদের বাবার সম্পর্কে কিছু জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। প্রসবের সময় তিনি কোনও চিকিৎসা সহায়তা পেয়েছিলেন কিনা, তা পুলিশ তদন্ত করছে।

পুলিশ জানিয়েছে, নিনা গুহায় পর্যাপ্ত মুদিখানার জিনিসপত্র মজুত করে রাখতেন। বর্ষাকালে তিনি এবং তার মেয়েরা খুব কম পোশাক পরে থাকতেন। তাদের কাছে মোমবাতি ছিল, তবে বেশিরভাগ সময় তারা প্রাকৃতিক আলোতেই জীবনযাপন করতেন। নিনা মাঝে মাঝে শহরে মুদিখানা কিনতে এবং সেই সময় তার ফোন চার্জ করতে যেতেন। তিনি তার মেয়েদের নিয়ে গোকর্ণ এবং অন্যান্য জায়গাতেও যেতেন, এবং সব কাজ সেরে আবার গুহায় ফিরে আসতেন।

পুলিশের মানবিক দৃষ্টি ও আবেগঘন বিদায়:

শ্রীধর বলেন, “১৮ বছরের চাকরিতে, আমি বনে এমন মা ও সন্তানদের কখনও দেখিনি। তারা দেখতে সুস্থ এবং মানসিকভাবে সুস্থ।” পুলিশ গুহার কাছে নীনার পরিত্যক্ত পাসপোর্ট খুঁজে পেয়েছে এবং বিদেশী আঞ্চলিক নিবন্ধন অফিসের (FRRO) সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। শনিবার রাতে, নিনা এবং তার মেয়েদের কারওয়ারের মহিলা অভ্যর্থনা কেন্দ্রে স্থানান্তরিত করা হয়।

রবিবার সকালে, নিনা শ্রীধরকে রাশিয়ান ভাষায় একটি হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা পাঠিয়ে ভারত এবং প্রকৃতির প্রতি তার গভীর ভালোবাসা প্রকাশ করেন। তিনি লিখেছেন, “আমাদের গুহা জীবন শেষ। আমাদের আরামদায়ক বাড়িটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। আমাদের এমন একটি কারাগারে রাখা হয়েছে যেখানে আকাশ নেই, ঘাস নেই, জলপ্রপাত নেই। বৃষ্টি এবং সাপ থেকে আমাদের রক্ষা করার নামে আমাদের শক্ত মেঝেতে ঘুমাতে বাধ্য করা হচ্ছে।”

নিনা তার বাচ্চাদের ছবি আঁকা, গান গাওয়া, জপ করা, যোগব্যায়াম করা এবং ব্যায়াম করার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সূচী তৈরি করে রেখেছিলেন। তার ফোনে বাচ্চাদের হাসিখুশি ছবি ছিল। শনিবার যখন তাদের একটি আশ্রমে রাখা হয়েছিল, তখন তার মেয়েরা বৈদ্যুতিক আলো এবং বিছানা দেখে খুব উত্তেজিত হয়েছিল, কারণ তারা আগে কখনও এমন অভিজ্ঞতা লাভ করেনি। প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা এই দুই শিশুর কাছে হয়তো ইট-পাথরের জীবন অনেকটাই নতুন।